প্রিয় বিদ্যালয়, সহকর্মী, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায় নেওয়ার কথা ছিল। তাঁকে ঘিরে ছিল আনন্দের আয়োজন। ছিল ফুল, ছিল ক্রেস্ট, ছিল ভালোবাসার মানুষের উপস্থিতি। সহকর্মীরা প্রস্তুত ছিলেন প্রিয় প্রধান শিক্ষককে বিদায়ী সংবর্ধনা জানাতে।
কিন্তু নিয়তির নির্মম পরিহাস—যে মানুষটিকে হাসিমুখে বিদায় জানানোর জন্য সবাই অপেক্ষায় ছিলেন, কয়েক ঘণ্টা পর সেই মানুষটির নিথর মরদেহই পৌঁছাল বিদ্যালয়ে।
অবসর জীবনে পা রাখার আনন্দঘন দিনটি মুহূর্তেই পরিণত হলো শোকের দিনে। সংবর্ধনার মঞ্চ হয়ে উঠল শোকের স্মৃতিচারণের স্থান। ফুলেল শুভেচ্ছার বদলে সহকর্মী-শিক্ষার্থীদের চোখে দেখা দিল অশ্রু। হাসি-আনন্দের আয়োজন রূপ নিল হৃদয়বিদারক বিদায়ে।
এমন মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে চাঁদপুরের হাজীগঞ্জ উপজেলার রাধাসার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক তপন কুমার সাহা তাঁর কর্মজীবনের শেষ কর্মদিবস সোমবার (৩১ আগস্ট) হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন।
দীর্ঘ কর্মজীবনের শেষ দিনে বিদ্যালয় থেকে আনুষ্ঠানিক বিদায় নেওয়ার কথা ছিল তাঁর। কিন্তু সেই বিদায় আর নেওয়া হলো না। জীবনের শেষ কর্মদিবসেই পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে চলে গেলেন না ফেরার দেশে।
আনন্দের আয়োজন বদলে গেল কান্নায়
বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা সোমবার দুপুরে তপন কুমার সাহাকে বিদায়ী সংবর্ধনা দেওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। তাঁর সম্মানে আয়োজন করা হয়েছিল বিশেষ অনুষ্ঠান। ছিল ক্রেস্ট প্রদানের প্রস্তুতিও। সহকর্মী, শিক্ষার্থী ও অতিথিদের উপস্থিতিতে প্রিয় প্রধান শিক্ষককে সম্মান জানিয়ে কর্মজীবনের ইতি টানার কথা ছিল।
কিন্তু ভোররাতে তাঁর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই বদলে যায় পুরো দৃশ্যপট।
যে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে সেদিন আনন্দের হাসি শোনা যাওয়ার কথা ছিল, সেখানে নেমে আসে নীরবতা। যে মানুষটির হাতে ক্রেস্ট তুলে দেওয়ার কথা ছিল, তাঁর মরদেহের পাশে দাঁড়িয়ে অশ্রুসিক্ত চোখে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে হয় সবাইকে।
সহকর্মী শিক্ষিকা তানজিলা আক্তার জানান, সোমবার দুপুরে তপন কুমার সাহাকে বিদায়ী সংবর্ধনা দেওয়ার পাশাপাশি ক্রেস্ট প্রদান করার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল। অনুষ্ঠানে সহকর্মী, শিক্ষার্থী ও অতিথিদের উপস্থিত থাকার কথা ছিল। কিন্তু ভোররাতে তাঁর মৃত্যুর খবর পেয়ে আনন্দের সেই আয়োজন মুহূর্তেই শোকে পরিণত হয়।
রাতের আঁধারে থেমে গেল জীবন
সহকর্মী শিক্ষিকা লিমা আক্তার জানান, রাত আনুমানিক ৩টার দিকে চাঁদপুর শহরের নিজ বাসভবনে হৃদরোগে আক্রান্ত হন তপন কুমার সাহা। আকস্মিক এ ঘটনায় পরিবারের সদস্যরা তাঁকে চিকিৎসকের কাছে নেওয়ার চেষ্টা করলেও তার আগেই তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।
মাত্র কয়েক ঘণ্টা পরই ছিল তাঁর কর্মজীবনের আনুষ্ঠানিক বিদায়। কিন্তু সেই অনুষ্ঠানে আর জীবিত অবস্থায় ফিরতে পারলেন না তিনি।
একজন শিক্ষকের জন্য এর চেয়ে নির্মম পরিণতি আর কী হতে পারে—যে বিদ্যালয়কে ঘিরে জীবনের দীর্ঘ সময় কাটিয়েছেন, সেই বিদ্যালয় থেকেই শেষবারের মতো বিদায় নিতে হলো তাঁকে, তবে জীবিত অবস্থায় নয়; নিথর দেহে।
‘সংবর্ধনা দিতে চেয়েছিলাম, শেষ বিদায় দিতে হলো’
স্থানীয় ইউপি সদস্য রবিউল আলম অরুন বলেন, তপন কুমার সাহাকে বিদ্যালয় থেকে বিদায়ী সংবর্ধনা দেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল। তিনিও অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকার কথা ছিল। কিন্তু আনন্দের অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার পরিবর্তে তাঁকে আজ চিরবিদায়ের সাক্ষী হতে হয়েছে।
তিনি বলেন, এমন অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুতে তিনি অত্যন্ত ব্যথিত ও ভারাক্রান্ত।
শেষ কর্মদিবসই হয়ে রইল শেষ দিন
তপন কুমার সাহার মৃত্যুতে রাধাসার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও স্থানীয়দের মধ্যে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
দীর্ঘ কর্মজীবনে অসংখ্য শিক্ষার্থীকে শিক্ষা দিয়েছেন তিনি। সহকর্মীদের সঙ্গে গড়ে তুলেছিলেন আত্মিক সম্পর্ক। বিদ্যালয়ের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল শুধু দায়িত্ব পালনের নয়, ছিল ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধের।
তাঁর শেষ কর্মদিবসটি হওয়ার কথা ছিল স্মরণীয় এক আনন্দের দিন—কর্মজীবনের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে অবসরে যাওয়ার দিন। সহকর্মীদের ভালোবাসা, শিক্ষার্থীদের শ্রদ্ধা আর শুভাকাঙ্ক্ষীদের শুভেচ্ছায় পূর্ণ হওয়ার কথা ছিল সেই দিন।
কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে সেই দিনটিই হয়ে গেল তাঁর জীবনের শেষ দিন।
বিদায় সংবর্ধনার জন্য যে মঞ্চ প্রস্তুত হয়েছিল, সেখানে উঠল না তাঁর হাসিমাখা মুখ।
ক্রেস্টটি হাতে তুলে দেওয়া হলো না তাঁকে।
সহকর্মীদের ভালোবাসার কথা শুনে শেষবারের মতো হাসলেন না তিনি।
বরং শেষ কর্মদিবসেই বিদ্যালয়ে ফিরলেন নিথর হয়ে।
মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী, এক ছেলে ও এক মেয়েসহ অসংখ্য সহকর্মী, শিক্ষার্থী ও শুভাকাঙ্ক্ষী রেখে গেছেন।
তাঁর এই আকস্মিক মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের জন্য নয়, রাধাসার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পুরো পরিবার এবং স্থানীয় মানুষের জন্যও অপূরণীয় শূন্যতা তৈরি করেছে।
যে দিন একজন শিক্ষক তাঁর কর্মজীবনের ইতি টেনে নতুন জীবনের পথে পা রাখার কথা ছিল, সেই দিনই থেমে গেল তাঁর জীবনের পথচলা।
আনন্দের বিদায় আর হলো না—
হয়ে গেল চিরবিদায়।




















