ঢাকা ১১:০৮ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শহর থেকে দূরে নতুন বিআরটিএ কার্যালয়, স্থান নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন

  • রিয়াজ শাওন
  • আপডেট : ০৮:৫০:২৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • 117

 

চাঁদপুরে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) নতুন কার্যালয়, মোটরযান চালনা পরীক্ষা, প্রশিক্ষণ ও বহুমুখী কেন্দ্র নির্মাণের জন্য শহর থেকে দূরে পৌরসভার ১৩ নম্বর ওয়ার্ডের খুলিশাডুলি এলাকায় ৩ একর ৫৯ শতাংশ জমি নির্ধারণ করা হয়েছে। এ জন্য ভূমি অধিগ্রহণের প্রক্রিয়াও সম্পন্ন হয়েছে। তবে প্রস্তাবিত স্থানটি শহর থেকে তুলনামূলক দূরে এবং সেখানে যাতায়াতের সড়ক সরু হওয়ায় স্থান নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।

 

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, খুলিশাডুলির প্রস্তাবিত জায়গায় যেতে যে সড়কটি ব্যবহার করতে হয়, সেটি তুলনামূলক সরু। সড়কের এক পাশে রয়েছে খাল, অন্য পাশে বসতবাড়ি। ফলে ভবিষ্যতে বিআরটিএ কার্যালয় চালু হলে সেবাগ্রহীতা, কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং বিভিন্ন ধরনের যানবাহনের চাপ বাড়লে বর্তমান সড়কটি সেই চাপ সামলাতে পারবে কি না, তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।

 

তবে প্রস্তাবিত জায়গাটি একেবারে যোগাযোগহীন নয়। চাঁদপুর শহরের বঙ্গবন্ধু সড়কের মাথা থেকে চাঁদপুর-রামগঞ্জ সড়কের সঙ্গে যুক্ত একটি নতুন সড়ক নির্মিত হয়েছে। ওই সড়কটি প্রস্তাবিত বিআরটিএ কার্যালয়ের জমির সামনে দিয়ে গিয়ে চাঁদপুর-কুমিল্লা আঞ্চলিক মহাসড়কের মটখোলা এলাকায় গিয়ে মিলিত হয়েছে। ফলে সড়ক যোগাযোগের একটি নতুন সংযোগ তৈরি হলেও এলাকাটি এখনো শহরের প্রচলিত ও ব্যস্ত যোগাযোগব্যবস্থার বাইরে থাকা অপেক্ষাকৃত অপ্রচলিত এলাকা।

 

স্থানীয়দের আশঙ্কা, বিআরটিএ কার্যালয় চালু হলে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষকে এই এলাকায় আসতে হবে। কিন্তু শহরের বিভিন্ন এলাকা থেকে সেবাগ্রহীতারা কীভাবে সহজে সেখানে পৌঁছাবেন, সেটিই বড় প্রশ্ন। বিশেষ করে গণপরিবহন বা অন্যান্য যানবাহন সহজে পাওয়া না গেলে দূরবর্তী এলাকা থেকে আসা সেবাপ্রত্যাশীদের অতিরিক্ত ভোগান্তিতে পড়তে হতে পারে।

 

স্থানীয় আবুল বলেন, “অফিসটা এত ভিতরে হলে দূর থেকে আসা মানুষ বিপদে পড়বে। যেমন মতলব উত্তর থেকে কেউ আসলে কিংবা কচুয়া থেকে কোনো মানুষ এলে তারা তো এই জায়গাটা একেবারেই চিনবে না। এটা শহর থেকে অনেক দূরে, একেবারে অপ্রচলিত একটা এলাকা। সাধারণ মানুষ এখানে কীভাবে সহজে আসবে, সেটাই বড় প্রশ্ন।”

 

বিআরটিএ কার্যালয়ে সাধারণত ড্রাইভিং লাইসেন্স, যানবাহনের নিবন্ধন, ফিটনেস, ড্রাইভিং পরীক্ষা ও অন্যান্য সেবা নিতে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ ও যানবাহনের চলাচল থাকে। এর সঙ্গে মোটরযান চালনা পরীক্ষা ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম যুক্ত হলে প্রস্তাবিত এলাকায় যানবাহনের চাপ আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এ কারণে কার্যালয় স্থাপনের ক্ষেত্রে শুধু জমির প্রাপ্যতা নয়, সহজ যোগাযোগ, সড়কের সক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ যানবাহনের চাপ বিবেচনা করা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

 

জানা গেছে, প্রস্তাবিত জায়গাটির ভূমি অধিগ্রহণের কার্যক্রম শুরু হয় ২০২০-২১ সালের দিকে। ওই এলাকায় কিছু খাস জমির পাশাপাশি ব্যক্তিমালিকানাধীন সম্পত্তিও রয়েছে। তবে ব্যক্তিমালিকানাধীন জমির মালিকদের মধ্যে বিরোধ থাকায় অধিগ্রহণের অর্থের একটি অংশ এখনো পরিশোধ করা হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

 

ফলে ভূমি অধিগ্রহণের কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর কয়েক বছর পেরিয়ে গেলেও জমির মালিকানা ও ক্ষতিপূরণ পরিশোধের বিষয়টি পুরোপুরি নিষ্পত্তি হয়নি বলে জানা গেছে।

 

সর্বশেষ ২০২৪ সালের আগস্টের পর জেলা প্রশাসনের ভূমি অধিগ্রহণ শাখা গেজেটের মাধ্যমে অধিগ্রহণ করা জায়গাটি সংশ্লিষ্ট সংস্থা বিআরটিএকে বুঝিয়ে দেয় বলে জানা গেছে। অর্থাৎ ভূমি অধিগ্রহণ ও হস্তান্তরের দীর্ঘ প্রক্রিয়া শেষে জায়গাটি বিআরটিএর ব্যবহারের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করা হয়েছে।

 

স্থান নির্বাচন নিয়ে প্রশ্নের মধ্যেই জানা গেছে, গত মাসের ৩১ তারিখে বিআরটিএর প্রধান কার্যালয়ের একটি প্রতিনিধি দল প্রস্তাবিত স্থানটি পরিদর্শন করেন। এ সময় বিআরটিএর পরিচালক (অডিট ও আইন) রুবাইয়াত আশিক, পরিচালক (প্রশিক্ষণ) মুতাম্মৎ মমতাজ, চট্টগ্রাম বিভাগের পরিচালক মাসুদ আলম এবং চাঁদপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) একরামুল ছিদ্দিকসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

 

পরিদর্শনের সময় প্রস্তাবিত স্থানে যাতায়াতের সড়ক এবং সড়ক প্রশস্তকরণের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে। এতে বোঝা যায়, কার্যালয় নির্মাণের পাশাপাশি ভবিষ্যতে বাড়তে পারে এমন যানবাহনের চাপ ও যোগাযোগব্যবস্থার বিষয়টিও সংশ্লিষ্টদের বিবেচনায় রয়েছে।

 

তবে এখানেই তৈরি হয়েছে নতুন প্রশ্ন। কার্যালয় চালু হওয়ার পর সড়ক প্রশস্ত করার প্রয়োজন হলে তা কীভাবে করা হবে? কারণ সড়কের এক পাশে খাল এবং অন্য পাশে বসতবাড়ি রয়েছে। ফলে সড়ক সম্প্রসারণ করতে হলে ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি অধিগ্রহণ, খালের পাড় সংরক্ষণ বা পুনর্বিন্যাস, মাটি ভরাট, পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং নতুন করে সড়ক উন্নয়নের প্রয়োজন হতে পারে।

 

স্থানীয়দের আশঙ্কা, প্রস্তাবিত স্থানে বিআরটিএ কার্যালয় নির্মাণের পর যানবাহন ও মানুষের চাপ বাড়লে বিদ্যমান সড়কটি প্রশস্ত করা ছাড়া বিকল্প নাও থাকতে পারে। আর সেই সড়ক প্রশস্ত করতে গেলে মূল কার্যালয় নির্মাণ ব্যয়ের বাইরে সরকারের অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ের সম্ভাবনা রয়েছে।

 

বিশেষ করে ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি অধিগ্রহণ করতে হলে জমির মূল্য ও অধিগ্রহণ-সংক্রান্ত ব্যয় যুক্ত হবে। পাশাপাশি খাল রক্ষা বা পুনর্বিন্যাস, মাটি ভরাট, পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং সড়ক নির্মাণ বা উন্নয়নের জন্যও বাড়তি অর্থ প্রয়োজন হতে পারে।

 

এ কারণে স্থানীয়দের প্রশ্ন, কার্যালয় স্থাপনের জন্য শহরের কাছাকাছি কিংবা আগে থেকেই উন্নত যোগাযোগব্যবস্থাসম্পন্ন কোনো বিকল্প স্থান কি যাচাই করা হয়েছিল? যদি বিকল্প স্থান যাচাই করা হয়ে থাকে, তাহলে তিন একর ৫৯ শতাংশ জমির এই স্থানটিকেই কেন চূড়ান্তভাবে নির্বাচন করা হলো?

 

স্থান নির্বাচন ও প্রকল্পের বিষয়ে জানতে বিআরটিএ চাঁদপুর সার্কেলের সহকারী পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) আবদুল্লাহ আল মামুনের সরকারি নম্বরে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে সেটি বন্ধ পাওয়া যায়। পরদিন তাঁর কার্যালয়ে গিয়ে তাঁকে পাওয়া যায়নি।

 

তবে এ বিষয়ে বিআরটিএর মোটরযান পরিদর্শক মো. সেকান্দরের সঙ্গে কথা হয়। তিনি বলেন, “এই বিষয়গুলো আমি সঠিকভাবে জানি না। কেন এই জায়গাটি বেছে নেওয়া হয়েছে, সেটিও আমার জানা নেই।”

 

ফলে গুরুত্বপূর্ণ এই সরকারি প্রকল্পের স্থান নির্বাচন, বিকল্প জায়গা যাচাই এবং ভবিষ্যৎ যোগাযোগব্যবস্থা নিয়ে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল কর্মকর্তার বক্তব্য এখনো পাওয়া যায়নি।

 

স্থানীয়দের মতে, একটি সরকারি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের কার্যালয় স্থাপনের ক্ষেত্রে শুধু পর্যাপ্ত জমি পাওয়া গেলেই হয় না। প্রতিদিনের সেবাগ্রহীতাদের যাতায়াত, যানবাহনের প্রবাহ, সড়কের প্রশস্ততা, ভবিষ্যতে সড়ক সম্প্রসারণের সুযোগ এবং প্রকল্পের দীর্ঘমেয়াদি ব্যয়ও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

 

বিশেষ করে বিআরটিএর মতো প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এখানে শুধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর যাতায়াত নয়, প্রতিদিন বিভিন্ন শ্রেণির যানবাহন নিয়ে সেবাগ্রহীতাদের আসা-যাওয়া এবং মোটরযান চালনা পরীক্ষার মতো কার্যক্রম থাকবে।

 

প্রস্তাবিত জায়গার সামনে দিয়ে নতুন সড়ক নির্মিত হওয়া এবং সেটি আঞ্চলিক মহাসড়কের সঙ্গে যুক্ত হওয়াকে ইতিবাচক দিক হিসেবে দেখা হলেও স্থানীয়দের প্রশ্ন, এই সড়কটি ভবিষ্যতে বিআরটিএ কার্যালয়ে আসা বিপুলসংখ্যক মানুষের চাপ সামলানোর জন্য কতটা উপযোগী। পাশাপাশি শহরের বিভিন্ন এলাকা, বিশেষ করে মতলব উত্তর ও কচুয়াসহ দূরবর্তী উপজেলা থেকে আসা সেবাপ্রত্যাশীদের সহজে ওই এলাকায় পৌঁছানোর জন্য পর্যাপ্ত গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে উঠবে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

 

তবে প্রস্তাবিত স্থানটি চূড়ান্তভাবে অনুপযুক্ত—এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার আগে কারিগরি সমীক্ষা, ভূমির অবস্থান, ভবিষ্যৎ সড়ক যোগাযোগ পরিকল্পনা এবং প্রকল্পের মোট ব্যয় বিবেচনা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে পরিদর্শনের সময় সড়ক প্রশস্তকরণ নিয়ে কী পরিকল্পনা বা সিদ্ধান্ত হয়েছে, সেটিও পরিষ্কার হওয়া দরকার।

 

স্থানীয়দের দাবি, নতুন বিআরটিএ কার্যালয় নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে শুধু জমির পরিমাণ ও প্রাপ্যতা নয়; সেবাগ্রহীতাদের সহজ যাতায়াত, যানবাহনের চাপ, সড়ক সম্প্রসারণের বাস্তব সম্ভাবনা, গণপরিবহন সুবিধা এবং ভবিষ্যতে সরকারের অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হোক।

 

এ বিষয়ে বিআরটিএ কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া গেলে স্থান নির্বাচনের কারণ, বিকল্প স্থান যাচাই, ভূমি অধিগ্রহণের প্রক্রিয়া, সড়ক প্রশস্তকরণের পরিকল্পনা, গণপরিবহন সুবিধা এবং সম্ভাব্য অতিরিক্ত ব্যয়ের বিষয়গুলো আরও স্পষ্ট হবে।

ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ

কচুয়ায় ফ্রি ভেটেরিনারি মেডিকেল ক্যাম্প অনুষ্ঠিত: বিনামূল্যে টিকা ও কৃমিনাশক প্রদান

শহর থেকে দূরে নতুন বিআরটিএ কার্যালয়, স্থান নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন

আপডেট : ০৮:৫০:২৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

 

চাঁদপুরে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) নতুন কার্যালয়, মোটরযান চালনা পরীক্ষা, প্রশিক্ষণ ও বহুমুখী কেন্দ্র নির্মাণের জন্য শহর থেকে দূরে পৌরসভার ১৩ নম্বর ওয়ার্ডের খুলিশাডুলি এলাকায় ৩ একর ৫৯ শতাংশ জমি নির্ধারণ করা হয়েছে। এ জন্য ভূমি অধিগ্রহণের প্রক্রিয়াও সম্পন্ন হয়েছে। তবে প্রস্তাবিত স্থানটি শহর থেকে তুলনামূলক দূরে এবং সেখানে যাতায়াতের সড়ক সরু হওয়ায় স্থান নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।

 

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, খুলিশাডুলির প্রস্তাবিত জায়গায় যেতে যে সড়কটি ব্যবহার করতে হয়, সেটি তুলনামূলক সরু। সড়কের এক পাশে রয়েছে খাল, অন্য পাশে বসতবাড়ি। ফলে ভবিষ্যতে বিআরটিএ কার্যালয় চালু হলে সেবাগ্রহীতা, কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং বিভিন্ন ধরনের যানবাহনের চাপ বাড়লে বর্তমান সড়কটি সেই চাপ সামলাতে পারবে কি না, তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।

 

তবে প্রস্তাবিত জায়গাটি একেবারে যোগাযোগহীন নয়। চাঁদপুর শহরের বঙ্গবন্ধু সড়কের মাথা থেকে চাঁদপুর-রামগঞ্জ সড়কের সঙ্গে যুক্ত একটি নতুন সড়ক নির্মিত হয়েছে। ওই সড়কটি প্রস্তাবিত বিআরটিএ কার্যালয়ের জমির সামনে দিয়ে গিয়ে চাঁদপুর-কুমিল্লা আঞ্চলিক মহাসড়কের মটখোলা এলাকায় গিয়ে মিলিত হয়েছে। ফলে সড়ক যোগাযোগের একটি নতুন সংযোগ তৈরি হলেও এলাকাটি এখনো শহরের প্রচলিত ও ব্যস্ত যোগাযোগব্যবস্থার বাইরে থাকা অপেক্ষাকৃত অপ্রচলিত এলাকা।

 

স্থানীয়দের আশঙ্কা, বিআরটিএ কার্যালয় চালু হলে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষকে এই এলাকায় আসতে হবে। কিন্তু শহরের বিভিন্ন এলাকা থেকে সেবাগ্রহীতারা কীভাবে সহজে সেখানে পৌঁছাবেন, সেটিই বড় প্রশ্ন। বিশেষ করে গণপরিবহন বা অন্যান্য যানবাহন সহজে পাওয়া না গেলে দূরবর্তী এলাকা থেকে আসা সেবাপ্রত্যাশীদের অতিরিক্ত ভোগান্তিতে পড়তে হতে পারে।

 

স্থানীয় আবুল বলেন, “অফিসটা এত ভিতরে হলে দূর থেকে আসা মানুষ বিপদে পড়বে। যেমন মতলব উত্তর থেকে কেউ আসলে কিংবা কচুয়া থেকে কোনো মানুষ এলে তারা তো এই জায়গাটা একেবারেই চিনবে না। এটা শহর থেকে অনেক দূরে, একেবারে অপ্রচলিত একটা এলাকা। সাধারণ মানুষ এখানে কীভাবে সহজে আসবে, সেটাই বড় প্রশ্ন।”

 

বিআরটিএ কার্যালয়ে সাধারণত ড্রাইভিং লাইসেন্স, যানবাহনের নিবন্ধন, ফিটনেস, ড্রাইভিং পরীক্ষা ও অন্যান্য সেবা নিতে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ ও যানবাহনের চলাচল থাকে। এর সঙ্গে মোটরযান চালনা পরীক্ষা ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম যুক্ত হলে প্রস্তাবিত এলাকায় যানবাহনের চাপ আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এ কারণে কার্যালয় স্থাপনের ক্ষেত্রে শুধু জমির প্রাপ্যতা নয়, সহজ যোগাযোগ, সড়কের সক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ যানবাহনের চাপ বিবেচনা করা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

 

জানা গেছে, প্রস্তাবিত জায়গাটির ভূমি অধিগ্রহণের কার্যক্রম শুরু হয় ২০২০-২১ সালের দিকে। ওই এলাকায় কিছু খাস জমির পাশাপাশি ব্যক্তিমালিকানাধীন সম্পত্তিও রয়েছে। তবে ব্যক্তিমালিকানাধীন জমির মালিকদের মধ্যে বিরোধ থাকায় অধিগ্রহণের অর্থের একটি অংশ এখনো পরিশোধ করা হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

 

ফলে ভূমি অধিগ্রহণের কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর কয়েক বছর পেরিয়ে গেলেও জমির মালিকানা ও ক্ষতিপূরণ পরিশোধের বিষয়টি পুরোপুরি নিষ্পত্তি হয়নি বলে জানা গেছে।

 

সর্বশেষ ২০২৪ সালের আগস্টের পর জেলা প্রশাসনের ভূমি অধিগ্রহণ শাখা গেজেটের মাধ্যমে অধিগ্রহণ করা জায়গাটি সংশ্লিষ্ট সংস্থা বিআরটিএকে বুঝিয়ে দেয় বলে জানা গেছে। অর্থাৎ ভূমি অধিগ্রহণ ও হস্তান্তরের দীর্ঘ প্রক্রিয়া শেষে জায়গাটি বিআরটিএর ব্যবহারের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করা হয়েছে।

 

স্থান নির্বাচন নিয়ে প্রশ্নের মধ্যেই জানা গেছে, গত মাসের ৩১ তারিখে বিআরটিএর প্রধান কার্যালয়ের একটি প্রতিনিধি দল প্রস্তাবিত স্থানটি পরিদর্শন করেন। এ সময় বিআরটিএর পরিচালক (অডিট ও আইন) রুবাইয়াত আশিক, পরিচালক (প্রশিক্ষণ) মুতাম্মৎ মমতাজ, চট্টগ্রাম বিভাগের পরিচালক মাসুদ আলম এবং চাঁদপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) একরামুল ছিদ্দিকসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

 

পরিদর্শনের সময় প্রস্তাবিত স্থানে যাতায়াতের সড়ক এবং সড়ক প্রশস্তকরণের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে। এতে বোঝা যায়, কার্যালয় নির্মাণের পাশাপাশি ভবিষ্যতে বাড়তে পারে এমন যানবাহনের চাপ ও যোগাযোগব্যবস্থার বিষয়টিও সংশ্লিষ্টদের বিবেচনায় রয়েছে।

 

তবে এখানেই তৈরি হয়েছে নতুন প্রশ্ন। কার্যালয় চালু হওয়ার পর সড়ক প্রশস্ত করার প্রয়োজন হলে তা কীভাবে করা হবে? কারণ সড়কের এক পাশে খাল এবং অন্য পাশে বসতবাড়ি রয়েছে। ফলে সড়ক সম্প্রসারণ করতে হলে ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি অধিগ্রহণ, খালের পাড় সংরক্ষণ বা পুনর্বিন্যাস, মাটি ভরাট, পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং নতুন করে সড়ক উন্নয়নের প্রয়োজন হতে পারে।

 

স্থানীয়দের আশঙ্কা, প্রস্তাবিত স্থানে বিআরটিএ কার্যালয় নির্মাণের পর যানবাহন ও মানুষের চাপ বাড়লে বিদ্যমান সড়কটি প্রশস্ত করা ছাড়া বিকল্প নাও থাকতে পারে। আর সেই সড়ক প্রশস্ত করতে গেলে মূল কার্যালয় নির্মাণ ব্যয়ের বাইরে সরকারের অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ের সম্ভাবনা রয়েছে।

 

বিশেষ করে ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি অধিগ্রহণ করতে হলে জমির মূল্য ও অধিগ্রহণ-সংক্রান্ত ব্যয় যুক্ত হবে। পাশাপাশি খাল রক্ষা বা পুনর্বিন্যাস, মাটি ভরাট, পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং সড়ক নির্মাণ বা উন্নয়নের জন্যও বাড়তি অর্থ প্রয়োজন হতে পারে।

 

এ কারণে স্থানীয়দের প্রশ্ন, কার্যালয় স্থাপনের জন্য শহরের কাছাকাছি কিংবা আগে থেকেই উন্নত যোগাযোগব্যবস্থাসম্পন্ন কোনো বিকল্প স্থান কি যাচাই করা হয়েছিল? যদি বিকল্প স্থান যাচাই করা হয়ে থাকে, তাহলে তিন একর ৫৯ শতাংশ জমির এই স্থানটিকেই কেন চূড়ান্তভাবে নির্বাচন করা হলো?

 

স্থান নির্বাচন ও প্রকল্পের বিষয়ে জানতে বিআরটিএ চাঁদপুর সার্কেলের সহকারী পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) আবদুল্লাহ আল মামুনের সরকারি নম্বরে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে সেটি বন্ধ পাওয়া যায়। পরদিন তাঁর কার্যালয়ে গিয়ে তাঁকে পাওয়া যায়নি।

 

তবে এ বিষয়ে বিআরটিএর মোটরযান পরিদর্শক মো. সেকান্দরের সঙ্গে কথা হয়। তিনি বলেন, “এই বিষয়গুলো আমি সঠিকভাবে জানি না। কেন এই জায়গাটি বেছে নেওয়া হয়েছে, সেটিও আমার জানা নেই।”

 

ফলে গুরুত্বপূর্ণ এই সরকারি প্রকল্পের স্থান নির্বাচন, বিকল্প জায়গা যাচাই এবং ভবিষ্যৎ যোগাযোগব্যবস্থা নিয়ে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল কর্মকর্তার বক্তব্য এখনো পাওয়া যায়নি।

 

স্থানীয়দের মতে, একটি সরকারি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের কার্যালয় স্থাপনের ক্ষেত্রে শুধু পর্যাপ্ত জমি পাওয়া গেলেই হয় না। প্রতিদিনের সেবাগ্রহীতাদের যাতায়াত, যানবাহনের প্রবাহ, সড়কের প্রশস্ততা, ভবিষ্যতে সড়ক সম্প্রসারণের সুযোগ এবং প্রকল্পের দীর্ঘমেয়াদি ব্যয়ও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

 

বিশেষ করে বিআরটিএর মতো প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এখানে শুধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর যাতায়াত নয়, প্রতিদিন বিভিন্ন শ্রেণির যানবাহন নিয়ে সেবাগ্রহীতাদের আসা-যাওয়া এবং মোটরযান চালনা পরীক্ষার মতো কার্যক্রম থাকবে।

 

প্রস্তাবিত জায়গার সামনে দিয়ে নতুন সড়ক নির্মিত হওয়া এবং সেটি আঞ্চলিক মহাসড়কের সঙ্গে যুক্ত হওয়াকে ইতিবাচক দিক হিসেবে দেখা হলেও স্থানীয়দের প্রশ্ন, এই সড়কটি ভবিষ্যতে বিআরটিএ কার্যালয়ে আসা বিপুলসংখ্যক মানুষের চাপ সামলানোর জন্য কতটা উপযোগী। পাশাপাশি শহরের বিভিন্ন এলাকা, বিশেষ করে মতলব উত্তর ও কচুয়াসহ দূরবর্তী উপজেলা থেকে আসা সেবাপ্রত্যাশীদের সহজে ওই এলাকায় পৌঁছানোর জন্য পর্যাপ্ত গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে উঠবে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

 

তবে প্রস্তাবিত স্থানটি চূড়ান্তভাবে অনুপযুক্ত—এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার আগে কারিগরি সমীক্ষা, ভূমির অবস্থান, ভবিষ্যৎ সড়ক যোগাযোগ পরিকল্পনা এবং প্রকল্পের মোট ব্যয় বিবেচনা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে পরিদর্শনের সময় সড়ক প্রশস্তকরণ নিয়ে কী পরিকল্পনা বা সিদ্ধান্ত হয়েছে, সেটিও পরিষ্কার হওয়া দরকার।

 

স্থানীয়দের দাবি, নতুন বিআরটিএ কার্যালয় নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে শুধু জমির পরিমাণ ও প্রাপ্যতা নয়; সেবাগ্রহীতাদের সহজ যাতায়াত, যানবাহনের চাপ, সড়ক সম্প্রসারণের বাস্তব সম্ভাবনা, গণপরিবহন সুবিধা এবং ভবিষ্যতে সরকারের অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হোক।

 

এ বিষয়ে বিআরটিএ কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া গেলে স্থান নির্বাচনের কারণ, বিকল্প স্থান যাচাই, ভূমি অধিগ্রহণের প্রক্রিয়া, সড়ক প্রশস্তকরণের পরিকল্পনা, গণপরিবহন সুবিধা এবং সম্ভাব্য অতিরিক্ত ব্যয়ের বিষয়গুলো আরও স্পষ্ট হবে।