ঢাকা ০৩:৫১ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পরবর্তী তারিখ: যে বিলম্বকে আমরা নিয়তি ভেবে নিয়েছি

আদালত চত্বরের একটা পরিচিত দৃশ্য আছে। ভোর থেকে গ্রামের মানুষ বাস ধরে জেলা শহরে আসেন। হাতে ভাঁজ করা কাগজের বান্ডিল, চোখে অনিশ্চয়তা। সারা দিন গাছতলায় বা বারান্দায় অপেক্ষা করেন। বিকেলে কেউ এসে বলেন, “আজও হয়নি, পরের তারিখ পড়েছে।” মানুষটি কিছু না বলে ফিরে যান। সামনের মাসে আবার আসবেন।
এই দৃশ্য এত পরিচিত যে আমরা এটাকে সমস্যা বলে ভাবিই না। বলি, “মামলার তো এমনই হয়।” আমাদের প্রবাদও তা-ই বলে: মামলা মানে তারিখ আর তারিখ মানে হয়রানি। কিন্তু একটা দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সমস্যা নিয়ম হয়ে গেলেও, সেটা নিয়ে প্রশ্ন তোলার প্রয়োজন ফুরিয়ে যায় না।
সংবিধান কী বলে
বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৫(৩) অনুচ্ছেদে বলা আছে, ফৌজদারি অপরাধে অভিযুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তির দ্রুত ও প্রকাশ্য বিচার পাওয়ার অধিকার রয়েছে। বিচার বিলম্বিত হলে সেটা কেবল প্রশাসনিক অসুবিধার বিষয় থাকে না, সাংবিধানিক অধিকারের প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়। আইনি সাহিত্যে বহুল প্রচলিত একটা নীতিকথা আছে: বিচার বিলম্বিত হওয়া মানে বিচার আংশিকভাবে অস্বীকার করার শামিল। কথাটা আমরা মুখস্থ জানি, কিন্তু নিজের বাস্তবতায় তার অর্থ নিয়ে খুব কমই ভাবি।
জাতীয় সংসদে দেওয়া সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের অধস্তন আদালতগুলোতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ছিল ৪০ লাখ ৪১ হাজার ৯২৪টি — এই তথ্য আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে জানিয়েছিলেন। সংখ্যাটা কাগজে একটা পরিসংখ্যান, কিন্তু বাস্তবে এটা লাখ লাখ মানুষের জীবনের অপেক্ষার গল্প।
তারিখের ভেতরের হিসাব
একটা কাল্পনিক উদাহরণ ধরা যাক। এক কৃষক তাঁর বাবার রেখে যাওয়া জমি নিয়ে ভাইদের সঙ্গে দেওয়ানি মামলায় জড়ালেন। মামলার শুরুতে তাঁর বয়স চল্লিশ। প্রতি তারিখে যাতায়াত, খাওয়া, উকিলের মুহুরির খরচ আছে, আর সেদিনের কাজ বাদ পড়ে। প্রক্রিয়ার নানা ধাপে—সময় চেয়ে আবেদন, সমন যথাসময়ে না পৌঁছানো, সাক্ষীর অনুপস্থিতি, মামলার জটে নতুন তারিখ পড়া—দেরি হতে থাকে। এভাবে বছর যায়, কখনো দশক যায়। শেষ পর্যন্ত রায় আসে ঠিকই, কিন্তু তত দিনে হয়তো বিরোধের কারণ হওয়া সম্পদের মূল্য মামলার খরচের কাছাকাছি নেমে আসে, অথবা মামলাকারী আর বেঁচে নেই। তখন সেই রায় ন্যায্য হলেও, বাস্তব জীবনে তার তাৎপর্য অনেকটাই ক্ষয়ে যায়।
ফৌজদারি মামলায় বিলম্বের প্রভাব আরও গভীর। অভিযুক্ত ব্যক্তি শেষ পর্যন্ত নির্দোষ প্রমাণিত হলেও, বিচার চলাকালীন বছরের পর বছর অনিশ্চয়তার বোঝা বহন করতে হয়—চাকরি, সামাজিক মর্যাদা, পারিবারিক স্থিতি সবকিছুতেই এর প্রভাব পড়ে। অন্যদিকে ভুক্তভোগী পক্ষ, বিশেষ করে আর্থিকভাবে দুর্বল বা প্রান্তিক মানুষ, দীর্ঘ প্রক্রিয়ার ক্লান্তিতে অনেক সময় ন্যায্য দাবি থেকে সরে আসতে বাধ্য হন। দীর্ঘসূত্রতার এই বাস্তবতা সাধারণত তাঁদের পক্ষেই সুবিধাজনক হয়ে ওঠে, যাঁদের অপেক্ষা করার সামর্থ্য আছে—আর্থিক বা সামাজিক অর্থে। এটা কোনো নির্দিষ্ট পক্ষের ইচ্ছাকৃত কারসাজি নয়, বরং প্রক্রিয়াগত বিলম্বের একটা কাঠামোগত পরিণতি।
কেন এমন হয়
কারণগুলো নতুন কিছু নয়, কিন্তু প্রকাশ্য আলোচনা কম।
প্রথমত, জনসংখ্যা ও মামলার সংখ্যার তুলনায় বিচারকের সংখ্যা সীমিত। ফলে প্রতিটি মামলার জন্য পর্যাপ্ত সময় বরাদ্দ করা কাঠামোগতভাবেই কঠিন হয়ে পড়ে।
দ্বিতীয়ত, বিদ্যমান পদ্ধতিতে মুলতবি বা সময় চেয়ে আবেদন করার সুযোগ তুলনামূলক উদার। এই সুযোগ ন্যায্য কারণে ব্যবহৃত হলে সমস্যা নেই, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে তা প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত করার একটা কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
তৃতীয়ত, সমন জারি ও সাক্ষী হাজির করার ব্যবস্থায় দুর্বলতা রয়েছে। একটা সমন প্রকৃত ঠিকানায় পৌঁছাতে কত মাস লেগে যায়, সেটা যাঁরা মামলা করেছেন তাঁরাই জানেন।
চতুর্থত, ফৌজদারি মামলায় তদন্ত ও প্রতিবেদন জমা দেওয়ার প্রক্রিয়ায় প্রায়ই বিলম্ব ঘটে।
পঞ্চমত, বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির ব্যবস্থার ব্যবহার এখনও সীমিত। আইনে মধ্যস্থতা ও গ্রাম আদালতের সুযোগ থাকলেও, অনেকে জানেনই না যে এসব পথ খোলা আছে। জানলেও অনেকে সরাসরি আদালতেই যেতে চান, কারণ “আদালতের রায়”-এর প্রতি একটা সামাজিক গুরুত্ব কাজ করে।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, বিচার বিভাগ নিজেও এই জট নিয়ে সচেতন। সাম্প্রতিক সময়ে মামলাজট কমাতে নতুন আদালত ও বিচারকের পদ সৃজন, প্রযুক্তিনির্ভর সমন জারির বিধান যুক্তকরণ এবং নিষ্পত্তি ত্বরান্বিত করতে মনিটরিং কমিটি গঠনের মতো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে সরকারি সূত্রে জানা যায়। অর্থাৎ সমস্যাটি স্বীকৃত এবং সমাধানের চেষ্টাও চলমান—প্রশ্ন হলো, সেই গতি পর্যাপ্ত কি না।
 আমরা প্রশ্ন করি না কেন
এই প্রশ্নটাই আসলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সমস্যাটা এত পুরোনো ও এত ব্যাপক যে মানুষ একে প্রায় প্রাকৃতিক নিয়মের মতো মেনে নিয়েছে।
এর একটা কারণ দ্বিধা। নিজের মামলা যে আদালতে চলছে, সেই প্রক্রিয়া নিয়ে প্রকাশ্যে প্রশ্ন তুলতে সাধারণ মানুষ স্বাভাবিকভাবেই সংকোচ বোধ করেন—পাছে তা তাঁর নিজের মামলার ওপর কোনোভাবে প্রভাব ফেলে। ফলে যিনি সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী, তিনিই প্রায়ই সবচেয়ে বেশি চুপ থাকেন।
আরেকটা কারণ আইনি সচেতনতার অভাব। অধিকাংশ মানুষ জানেন না, দ্রুত বিচার তাঁর সাংবিধানিক অধিকার। তিনি জানেন না, অকারণ বিলম্বের বিরুদ্ধে আপত্তি জানানোর আইনি পথ আছে। তিনি জানেন না, নিজের মামলার অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাওয়া তাঁর ন্যায্য অধিকার। আইনকে আমরা দেখি “উকিল-মোক্তারের বিষয়” হিসেবে, নিজের জীবনের বিষয় হিসেবে নয়।
কী করা যায়
সমাধান একটা জাদুকরী সংস্কারে নেই, তবে কিছু পথ স্পষ্ট।
বিচারক নিয়োগ আরও বাড়ানো এবং তাঁদের প্রশিক্ষণ ও অবকাঠামোগত সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি। মামলার ধরন অনুযায়ী সময়সীমা নির্ধারণ এবং যথাযথ কারণ ছাড়া মুলতবি নিরুৎসাহিত করার বিদ্যমান বিধানগুলোর কঠোর ও সমতাভিত্তিক প্রয়োগ প্রয়োজন।
প্রযুক্তির ব্যবহারও কাজে আসবে। ডিজিটাল মামলা ব্যবস্থাপনা, অনলাইনে মামলার অবস্থা জানার সুযোগ এবং ইলেকট্রনিক সমন জারির মতো উদ্যোগ ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে; এগুলো দেশজুড়ে সমানভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে কি না, তা নিয়মিত পর্যালোচনার দাবি রাখে।
মধ্যস্থতা ও সালিশের মতো বিকল্প ব্যবস্থাকে আরও জনপ্রিয় করতে হবে, পাশাপাশি নিশ্চিত করতে হবে যেন এসব ব্যবস্থা কোনো পক্ষের বিরুদ্ধে অসম চাপের হাতিয়ার হয়ে না ওঠে।
সবচেয়ে বড় কথা, নাগরিক সচেতনতা। স্কুল-কলেজের পাঠ্যক্রমে, গণমাধ্যমে, স্থানীয় সরকারের কার্যক্রমে নাগরিক অধিকার ও বিচারপ্রক্রিয়ার প্রাথমিক কাঠামো নিয়ে খোলামেলা আলোচনা হওয়া দরকার। মানুষ যখন জানবেন যে দ্রুত বিচার তাঁর অধিকার, তখনই যথাযথভাবে প্রশ্ন তোলার সংস্কৃতি গড়ে উঠবে।
শেষ কথা
“পরবর্তী তারিখ” শব্দ দুটো আমাদের সমাজে এতটাই মিশে গেছে যে এটা নিয়ে ভাবাই বাহুল্য মনে হয়। অথচ এই দুটো শব্দের আড়ালে লুকিয়ে আছে অসংখ্য মানুষের ক্ষয়ে যাওয়া সময়, অর্থ ও আস্থা। রাষ্ট্র নাগরিককে যে ন্যায়বিচারের প্রতিশ্রুতি দেয়, সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষার একটা গুরুত্বপূর্ণ শর্ত সময়োপযোগী বিচার।
এই প্রশ্ন তোলা আদালত বা বিচারব্যবস্থার প্রতি অশ্রদ্ধা নয়—বরং এটি একটি সুস্থ ব্যবস্থার প্রতি নাগরিকের যৌক্তিক প্রত্যাশা ও দায়িত্ব। ন্যায়বিচার যেন কারও প্রতীক্ষার চেয়ে দীর্ঘ না হয়ে ওঠে, এটুকু চাওয়া আমরা করতেই পারি
লেখক:
সুস্মিতা কর্মকার
শিক্ষার্থী
ইউআইটিএস, আইন বিভাগ
ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ

কুয়েতে মা’দ’কসহ ফরিদগঞ্জের সাবেক ইউপি সদস্য গ্রে’প্তার

পরবর্তী তারিখ: যে বিলম্বকে আমরা নিয়তি ভেবে নিয়েছি

আপডেট : ০২:৪৫:৩৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
আদালত চত্বরের একটা পরিচিত দৃশ্য আছে। ভোর থেকে গ্রামের মানুষ বাস ধরে জেলা শহরে আসেন। হাতে ভাঁজ করা কাগজের বান্ডিল, চোখে অনিশ্চয়তা। সারা দিন গাছতলায় বা বারান্দায় অপেক্ষা করেন। বিকেলে কেউ এসে বলেন, “আজও হয়নি, পরের তারিখ পড়েছে।” মানুষটি কিছু না বলে ফিরে যান। সামনের মাসে আবার আসবেন।
এই দৃশ্য এত পরিচিত যে আমরা এটাকে সমস্যা বলে ভাবিই না। বলি, “মামলার তো এমনই হয়।” আমাদের প্রবাদও তা-ই বলে: মামলা মানে তারিখ আর তারিখ মানে হয়রানি। কিন্তু একটা দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সমস্যা নিয়ম হয়ে গেলেও, সেটা নিয়ে প্রশ্ন তোলার প্রয়োজন ফুরিয়ে যায় না।
সংবিধান কী বলে
বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৫(৩) অনুচ্ছেদে বলা আছে, ফৌজদারি অপরাধে অভিযুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তির দ্রুত ও প্রকাশ্য বিচার পাওয়ার অধিকার রয়েছে। বিচার বিলম্বিত হলে সেটা কেবল প্রশাসনিক অসুবিধার বিষয় থাকে না, সাংবিধানিক অধিকারের প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়। আইনি সাহিত্যে বহুল প্রচলিত একটা নীতিকথা আছে: বিচার বিলম্বিত হওয়া মানে বিচার আংশিকভাবে অস্বীকার করার শামিল। কথাটা আমরা মুখস্থ জানি, কিন্তু নিজের বাস্তবতায় তার অর্থ নিয়ে খুব কমই ভাবি।
জাতীয় সংসদে দেওয়া সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের অধস্তন আদালতগুলোতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ছিল ৪০ লাখ ৪১ হাজার ৯২৪টি — এই তথ্য আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে জানিয়েছিলেন। সংখ্যাটা কাগজে একটা পরিসংখ্যান, কিন্তু বাস্তবে এটা লাখ লাখ মানুষের জীবনের অপেক্ষার গল্প।
তারিখের ভেতরের হিসাব
একটা কাল্পনিক উদাহরণ ধরা যাক। এক কৃষক তাঁর বাবার রেখে যাওয়া জমি নিয়ে ভাইদের সঙ্গে দেওয়ানি মামলায় জড়ালেন। মামলার শুরুতে তাঁর বয়স চল্লিশ। প্রতি তারিখে যাতায়াত, খাওয়া, উকিলের মুহুরির খরচ আছে, আর সেদিনের কাজ বাদ পড়ে। প্রক্রিয়ার নানা ধাপে—সময় চেয়ে আবেদন, সমন যথাসময়ে না পৌঁছানো, সাক্ষীর অনুপস্থিতি, মামলার জটে নতুন তারিখ পড়া—দেরি হতে থাকে। এভাবে বছর যায়, কখনো দশক যায়। শেষ পর্যন্ত রায় আসে ঠিকই, কিন্তু তত দিনে হয়তো বিরোধের কারণ হওয়া সম্পদের মূল্য মামলার খরচের কাছাকাছি নেমে আসে, অথবা মামলাকারী আর বেঁচে নেই। তখন সেই রায় ন্যায্য হলেও, বাস্তব জীবনে তার তাৎপর্য অনেকটাই ক্ষয়ে যায়।
ফৌজদারি মামলায় বিলম্বের প্রভাব আরও গভীর। অভিযুক্ত ব্যক্তি শেষ পর্যন্ত নির্দোষ প্রমাণিত হলেও, বিচার চলাকালীন বছরের পর বছর অনিশ্চয়তার বোঝা বহন করতে হয়—চাকরি, সামাজিক মর্যাদা, পারিবারিক স্থিতি সবকিছুতেই এর প্রভাব পড়ে। অন্যদিকে ভুক্তভোগী পক্ষ, বিশেষ করে আর্থিকভাবে দুর্বল বা প্রান্তিক মানুষ, দীর্ঘ প্রক্রিয়ার ক্লান্তিতে অনেক সময় ন্যায্য দাবি থেকে সরে আসতে বাধ্য হন। দীর্ঘসূত্রতার এই বাস্তবতা সাধারণত তাঁদের পক্ষেই সুবিধাজনক হয়ে ওঠে, যাঁদের অপেক্ষা করার সামর্থ্য আছে—আর্থিক বা সামাজিক অর্থে। এটা কোনো নির্দিষ্ট পক্ষের ইচ্ছাকৃত কারসাজি নয়, বরং প্রক্রিয়াগত বিলম্বের একটা কাঠামোগত পরিণতি।
কেন এমন হয়
কারণগুলো নতুন কিছু নয়, কিন্তু প্রকাশ্য আলোচনা কম।
প্রথমত, জনসংখ্যা ও মামলার সংখ্যার তুলনায় বিচারকের সংখ্যা সীমিত। ফলে প্রতিটি মামলার জন্য পর্যাপ্ত সময় বরাদ্দ করা কাঠামোগতভাবেই কঠিন হয়ে পড়ে।
দ্বিতীয়ত, বিদ্যমান পদ্ধতিতে মুলতবি বা সময় চেয়ে আবেদন করার সুযোগ তুলনামূলক উদার। এই সুযোগ ন্যায্য কারণে ব্যবহৃত হলে সমস্যা নেই, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে তা প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত করার একটা কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
তৃতীয়ত, সমন জারি ও সাক্ষী হাজির করার ব্যবস্থায় দুর্বলতা রয়েছে। একটা সমন প্রকৃত ঠিকানায় পৌঁছাতে কত মাস লেগে যায়, সেটা যাঁরা মামলা করেছেন তাঁরাই জানেন।
চতুর্থত, ফৌজদারি মামলায় তদন্ত ও প্রতিবেদন জমা দেওয়ার প্রক্রিয়ায় প্রায়ই বিলম্ব ঘটে।
পঞ্চমত, বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির ব্যবস্থার ব্যবহার এখনও সীমিত। আইনে মধ্যস্থতা ও গ্রাম আদালতের সুযোগ থাকলেও, অনেকে জানেনই না যে এসব পথ খোলা আছে। জানলেও অনেকে সরাসরি আদালতেই যেতে চান, কারণ “আদালতের রায়”-এর প্রতি একটা সামাজিক গুরুত্ব কাজ করে।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, বিচার বিভাগ নিজেও এই জট নিয়ে সচেতন। সাম্প্রতিক সময়ে মামলাজট কমাতে নতুন আদালত ও বিচারকের পদ সৃজন, প্রযুক্তিনির্ভর সমন জারির বিধান যুক্তকরণ এবং নিষ্পত্তি ত্বরান্বিত করতে মনিটরিং কমিটি গঠনের মতো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে সরকারি সূত্রে জানা যায়। অর্থাৎ সমস্যাটি স্বীকৃত এবং সমাধানের চেষ্টাও চলমান—প্রশ্ন হলো, সেই গতি পর্যাপ্ত কি না।
 আমরা প্রশ্ন করি না কেন
এই প্রশ্নটাই আসলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সমস্যাটা এত পুরোনো ও এত ব্যাপক যে মানুষ একে প্রায় প্রাকৃতিক নিয়মের মতো মেনে নিয়েছে।
এর একটা কারণ দ্বিধা। নিজের মামলা যে আদালতে চলছে, সেই প্রক্রিয়া নিয়ে প্রকাশ্যে প্রশ্ন তুলতে সাধারণ মানুষ স্বাভাবিকভাবেই সংকোচ বোধ করেন—পাছে তা তাঁর নিজের মামলার ওপর কোনোভাবে প্রভাব ফেলে। ফলে যিনি সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী, তিনিই প্রায়ই সবচেয়ে বেশি চুপ থাকেন।
আরেকটা কারণ আইনি সচেতনতার অভাব। অধিকাংশ মানুষ জানেন না, দ্রুত বিচার তাঁর সাংবিধানিক অধিকার। তিনি জানেন না, অকারণ বিলম্বের বিরুদ্ধে আপত্তি জানানোর আইনি পথ আছে। তিনি জানেন না, নিজের মামলার অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাওয়া তাঁর ন্যায্য অধিকার। আইনকে আমরা দেখি “উকিল-মোক্তারের বিষয়” হিসেবে, নিজের জীবনের বিষয় হিসেবে নয়।
কী করা যায়
সমাধান একটা জাদুকরী সংস্কারে নেই, তবে কিছু পথ স্পষ্ট।
বিচারক নিয়োগ আরও বাড়ানো এবং তাঁদের প্রশিক্ষণ ও অবকাঠামোগত সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি। মামলার ধরন অনুযায়ী সময়সীমা নির্ধারণ এবং যথাযথ কারণ ছাড়া মুলতবি নিরুৎসাহিত করার বিদ্যমান বিধানগুলোর কঠোর ও সমতাভিত্তিক প্রয়োগ প্রয়োজন।
প্রযুক্তির ব্যবহারও কাজে আসবে। ডিজিটাল মামলা ব্যবস্থাপনা, অনলাইনে মামলার অবস্থা জানার সুযোগ এবং ইলেকট্রনিক সমন জারির মতো উদ্যোগ ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে; এগুলো দেশজুড়ে সমানভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে কি না, তা নিয়মিত পর্যালোচনার দাবি রাখে।
মধ্যস্থতা ও সালিশের মতো বিকল্প ব্যবস্থাকে আরও জনপ্রিয় করতে হবে, পাশাপাশি নিশ্চিত করতে হবে যেন এসব ব্যবস্থা কোনো পক্ষের বিরুদ্ধে অসম চাপের হাতিয়ার হয়ে না ওঠে।
সবচেয়ে বড় কথা, নাগরিক সচেতনতা। স্কুল-কলেজের পাঠ্যক্রমে, গণমাধ্যমে, স্থানীয় সরকারের কার্যক্রমে নাগরিক অধিকার ও বিচারপ্রক্রিয়ার প্রাথমিক কাঠামো নিয়ে খোলামেলা আলোচনা হওয়া দরকার। মানুষ যখন জানবেন যে দ্রুত বিচার তাঁর অধিকার, তখনই যথাযথভাবে প্রশ্ন তোলার সংস্কৃতি গড়ে উঠবে।
শেষ কথা
“পরবর্তী তারিখ” শব্দ দুটো আমাদের সমাজে এতটাই মিশে গেছে যে এটা নিয়ে ভাবাই বাহুল্য মনে হয়। অথচ এই দুটো শব্দের আড়ালে লুকিয়ে আছে অসংখ্য মানুষের ক্ষয়ে যাওয়া সময়, অর্থ ও আস্থা। রাষ্ট্র নাগরিককে যে ন্যায়বিচারের প্রতিশ্রুতি দেয়, সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষার একটা গুরুত্বপূর্ণ শর্ত সময়োপযোগী বিচার।
এই প্রশ্ন তোলা আদালত বা বিচারব্যবস্থার প্রতি অশ্রদ্ধা নয়—বরং এটি একটি সুস্থ ব্যবস্থার প্রতি নাগরিকের যৌক্তিক প্রত্যাশা ও দায়িত্ব। ন্যায়বিচার যেন কারও প্রতীক্ষার চেয়ে দীর্ঘ না হয়ে ওঠে, এটুকু চাওয়া আমরা করতেই পারি
লেখক:
সুস্মিতা কর্মকার
শিক্ষার্থী
ইউআইটিএস, আইন বিভাগ