ঢাকা ০৫:৩৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ভালোবাসার দায়ে ২৩ বছর জেল খেটেছেন শফিকুল, কিন্তু তার ‘পুতুল’ এখন অন্যের

একদিন একটি চিঠি পেয়ে রাতের অন্ধকারে ভালোবাসার মানুষটিকে নিয়ে ঘর ছেড়েছিলেন তিনি। সেই ভালোবাসার মূল্য দিতে গিয়ে হারিয়েছেন জীবনের ২৩টি বছর।
২৩ বছর পর যখন মুক্ত আকাশের নিচে ফিরলেন, তখন পৃথিবী বদলে গেছে—শুধু বদলায়নি কিছু পুরোনো স্মৃতি।
২০০৩ সালের সেই রাতের কথা হয়তো আজও ভুলতে পারেননি শেরপুরের ঝিনাইগাতীর শফিকুল ইসলাম।
তখন তিনি তরুণ। দরিদ্র কসাই পরিবারের সন্তান। বাবার সঙ্গে অভিমান করে বাড়ি ছেড়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন দূরসম্পর্কের আত্মীয় জব্বার মাস্টারের বাড়িতে। সেখানে কাজ করতে গিয়েই পরিচয় হয় জব্বার মাস্টারের মেয়ে পুতুলের সঙ্গে।
পরিচয়, কথা বলা, একসঙ্গে থাকা—কখন যে সেই সম্পর্ক ভালোবাসায় পরিণত হয়েছিল, তা হয়তো দুজনের কেউই বুঝতে পারেননি।
কিন্তু তাদের সম্পর্ক সহজ ছিল না।
একদিকে পারিবারিক সম্পর্ক, অন্যদিকে আর্থিক ও সামাজিক ব্যবধান। শফিকুল জানতেন, পুতুলের পরিবার তাকে মেনে নেবে না।
তাই ভালোবাসার কথা জেনেও তিনি প্রথমে পিছিয়ে যেতে চেয়েছিলেন।
কিন্তু পুতুল নাকি পিছিয়ে যাননি।
একসময় তাদের সম্পর্কের কথা পরিবারে জানাজানি হয়ে যায়। শফিকুলকে মারধর করে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়।
তারপর আসে সেই রাত।
পুতুলের মা অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে গেলে পরিবারের অন্য সদস্যরাও তার সঙ্গে চলে যান। বাড়িতে যাওয়ার আগে পুতুলের কাছে রেখে যাওয়া হয় ৬৫ হাজার টাকা।
সেই রাতে বান্ধবীর মাধ্যমে শফিকুলের কাছে পৌঁছে যায় একটি চিঠি।
চিঠিতে তাকে রাতে এসে নিয়ে যেতে বলা হয়। না এলে আত্মহত্যা করার কথাও জানানো হয়েছিল বলে বর্ণনা রয়েছে।
চিঠি পাওয়ার পর আর স্থির থাকতে পারেননি শফিকুল।
দুই দাদা বিল্লাল আলী ও সেকান্দর আলীকে সঙ্গে নিয়ে রাতে পুতুলদের বাড়িতে যান তিনি। পরে পুতুলকে নিয়ে এসে বিয়ে করেন।
সকালে বাড়ি ফিরে মেয়েকে না পেয়ে পুতুলের পরিবার থানায় মামলা করে।
এরপর শুরু হয় আরেক অধ্যায়।
সালিশ হলো। পুতুল শফিকুলের সঙ্গে সংসার করতে চান বলে জানান বলে জানা যায়। কিন্তু দুই পরিবারের বিরোধ থামেনি। একপর্যায়ে মারামারিও হয়।
শেষ পর্যন্ত পুলিশ শফিকুল, তার দুই সহযোগী এবং পুতুলকে গ্রেপ্তার করে।
আদালতে পুতুল ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন। সেখানে শফিকুল ও তার দুই সহযোগীর বিরুদ্ধে জোর করে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ করেন।
মামলার বিচার শেষে শফিকুলসহ অন্যদের কারাদণ্ড ও জরিমানা হয়।
তারপর শুরু হয় শফিকুলের জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ সময়।
এক বছর… পাঁচ বছর… দশ বছর… বিশ বছর…
এভাবেই কেটে যায় ২৩ বছর।
কারাগারের চার দেয়ালের মধ্যে হারিয়ে যায় তার যৌবন।
যে বয়সে মানুষ সংসার গড়ে, সন্তানকে বড় হতে দেখে, বাবা-মায়ের পাশে দাঁড়ায়—সেই বয়সের বড় একটি অংশ তিনি কাটিয়েছেন বন্দিজীবনে।
ছেলের মুক্তির আশায় তার বাবাও বছরের পর বছর আদালতের বারান্দায় ঘুরেছেন।
কিন্তু সেই অপেক্ষার শেষ দেখতে পারেননি তিনি।
ছেলের মুক্তির আগেই মারা যান বাবা।
অবশেষে আসে সেই দিন।
২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬।
দীর্ঘ ২৩ বছর পর আপিলের মাধ্যমে কারাগার থেকে মুক্তি পান শফিকুল।
কারাগারের দরজা খুলে গেল।
কিন্তু যে জীবনটাকে তিনি ২৩ বছর আগে রেখে গিয়েছিলেন, সেটি আর সেখানে ছিল না।
সময় চলে গেছে।
মানুষ বদলে গেছে।
আর পুতুল?
পুতুল এখন অন্যের স্ত্রী। স্বামী-সন্তান নিয়ে তার নিজের সংসার।
শফিকুলের সামনে তাই মুক্ত পৃথিবী, কিন্তু নেই সেই মানুষটি—যার জন্য একদিন তিনি রাতের অন্ধকারে ঘর ছেড়েছিলেন।
অদ্ভুতভাবে, এতকিছুর পরও পুতুলের প্রতি তার মনে নাকি কোনো ঘৃণা নেই।
তার অনুভূতি যেন এখনও সেই পুরোনো জায়গাতেই আটকে আছে—
“কাছে না পেলেও দূর থেকে দেখতে পারব তাকে। কখনো ঘৃণা করব না। ভালোবেসেছি, ভালোবেসেই যাব।”
কিন্তু ভালোবাসার পাশাপাশি বুকের ভেতর একটি প্রশ্নও রয়ে গেছে।
যে মানুষটি একদিন চিঠি লিখে তাকে নিজের কাছে ডেকেছিলেন, সেই মানুষটিই পরে আদালতে তার বিরুদ্ধে জবানবন্দি দিলেন কেন?
২৩ বছর কেটে গেছে।
প্রশ্নটি পুরোনো হয়েছে, কিন্তু উত্তরটি এখনও অজানা।
হয়তো পুতুলের কাছে তার উত্তর আছে।
হয়তো সময়ের কোনো এক মোড়ে তাদের দুজনের গল্পের এমন কিছু অধ্যায় আছে, যা শফিকুল কখনো জানতে পারেননি।
তবে আজ আর সেই উত্তর দিয়ে অতীত বদলানোর সুযোগ নেই।
একজন নিজের সংসারে।
অন্যজন ২৩ বছর পর ফিরে এসেছেন মুক্ত জীবনে।
মাঝখানে পড়ে আছে একটি চিঠি, একটি রাত, একটি ভালোবাসা আর ২৩ বছরের দীর্ঘ বিচ্ছেদ।
কিছু মানুষকে জীবন থেকে হারিয়ে ফেলা যায়, কিন্তু স্মৃতি থেকে নয়।
আর কিছু ভালোবাসা কাছে এসে পূর্ণতা পায় না—
দূরে সরে গিয়েও সারাজীবন অসমাপ্ত থেকে যায়।
শফিকুল ও পুতুলের গল্প হয়তো তেমনই এক গল্প।
যার শুরু হয়েছিল ভালোবাসায়, আর যার শেষটুকু লিখে দিয়েছে সময়।

 

সংগৃহীত

ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ

হাজীগঞ্জের নিখোঁজ দুলালকে পাওয়া গেছে: পরিবার ও স্বজনদের মধ্যে স্বস্তি

ভালোবাসার দায়ে ২৩ বছর জেল খেটেছেন শফিকুল, কিন্তু তার ‘পুতুল’ এখন অন্যের

আপডেট : ০৪:৩৫:৪৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

একদিন একটি চিঠি পেয়ে রাতের অন্ধকারে ভালোবাসার মানুষটিকে নিয়ে ঘর ছেড়েছিলেন তিনি। সেই ভালোবাসার মূল্য দিতে গিয়ে হারিয়েছেন জীবনের ২৩টি বছর।
২৩ বছর পর যখন মুক্ত আকাশের নিচে ফিরলেন, তখন পৃথিবী বদলে গেছে—শুধু বদলায়নি কিছু পুরোনো স্মৃতি।
২০০৩ সালের সেই রাতের কথা হয়তো আজও ভুলতে পারেননি শেরপুরের ঝিনাইগাতীর শফিকুল ইসলাম।
তখন তিনি তরুণ। দরিদ্র কসাই পরিবারের সন্তান। বাবার সঙ্গে অভিমান করে বাড়ি ছেড়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন দূরসম্পর্কের আত্মীয় জব্বার মাস্টারের বাড়িতে। সেখানে কাজ করতে গিয়েই পরিচয় হয় জব্বার মাস্টারের মেয়ে পুতুলের সঙ্গে।
পরিচয়, কথা বলা, একসঙ্গে থাকা—কখন যে সেই সম্পর্ক ভালোবাসায় পরিণত হয়েছিল, তা হয়তো দুজনের কেউই বুঝতে পারেননি।
কিন্তু তাদের সম্পর্ক সহজ ছিল না।
একদিকে পারিবারিক সম্পর্ক, অন্যদিকে আর্থিক ও সামাজিক ব্যবধান। শফিকুল জানতেন, পুতুলের পরিবার তাকে মেনে নেবে না।
তাই ভালোবাসার কথা জেনেও তিনি প্রথমে পিছিয়ে যেতে চেয়েছিলেন।
কিন্তু পুতুল নাকি পিছিয়ে যাননি।
একসময় তাদের সম্পর্কের কথা পরিবারে জানাজানি হয়ে যায়। শফিকুলকে মারধর করে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়।
তারপর আসে সেই রাত।
পুতুলের মা অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে গেলে পরিবারের অন্য সদস্যরাও তার সঙ্গে চলে যান। বাড়িতে যাওয়ার আগে পুতুলের কাছে রেখে যাওয়া হয় ৬৫ হাজার টাকা।
সেই রাতে বান্ধবীর মাধ্যমে শফিকুলের কাছে পৌঁছে যায় একটি চিঠি।
চিঠিতে তাকে রাতে এসে নিয়ে যেতে বলা হয়। না এলে আত্মহত্যা করার কথাও জানানো হয়েছিল বলে বর্ণনা রয়েছে।
চিঠি পাওয়ার পর আর স্থির থাকতে পারেননি শফিকুল।
দুই দাদা বিল্লাল আলী ও সেকান্দর আলীকে সঙ্গে নিয়ে রাতে পুতুলদের বাড়িতে যান তিনি। পরে পুতুলকে নিয়ে এসে বিয়ে করেন।
সকালে বাড়ি ফিরে মেয়েকে না পেয়ে পুতুলের পরিবার থানায় মামলা করে।
এরপর শুরু হয় আরেক অধ্যায়।
সালিশ হলো। পুতুল শফিকুলের সঙ্গে সংসার করতে চান বলে জানান বলে জানা যায়। কিন্তু দুই পরিবারের বিরোধ থামেনি। একপর্যায়ে মারামারিও হয়।
শেষ পর্যন্ত পুলিশ শফিকুল, তার দুই সহযোগী এবং পুতুলকে গ্রেপ্তার করে।
আদালতে পুতুল ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন। সেখানে শফিকুল ও তার দুই সহযোগীর বিরুদ্ধে জোর করে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ করেন।
মামলার বিচার শেষে শফিকুলসহ অন্যদের কারাদণ্ড ও জরিমানা হয়।
তারপর শুরু হয় শফিকুলের জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ সময়।
এক বছর… পাঁচ বছর… দশ বছর… বিশ বছর…
এভাবেই কেটে যায় ২৩ বছর।
কারাগারের চার দেয়ালের মধ্যে হারিয়ে যায় তার যৌবন।
যে বয়সে মানুষ সংসার গড়ে, সন্তানকে বড় হতে দেখে, বাবা-মায়ের পাশে দাঁড়ায়—সেই বয়সের বড় একটি অংশ তিনি কাটিয়েছেন বন্দিজীবনে।
ছেলের মুক্তির আশায় তার বাবাও বছরের পর বছর আদালতের বারান্দায় ঘুরেছেন।
কিন্তু সেই অপেক্ষার শেষ দেখতে পারেননি তিনি।
ছেলের মুক্তির আগেই মারা যান বাবা।
অবশেষে আসে সেই দিন।
২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬।
দীর্ঘ ২৩ বছর পর আপিলের মাধ্যমে কারাগার থেকে মুক্তি পান শফিকুল।
কারাগারের দরজা খুলে গেল।
কিন্তু যে জীবনটাকে তিনি ২৩ বছর আগে রেখে গিয়েছিলেন, সেটি আর সেখানে ছিল না।
সময় চলে গেছে।
মানুষ বদলে গেছে।
আর পুতুল?
পুতুল এখন অন্যের স্ত্রী। স্বামী-সন্তান নিয়ে তার নিজের সংসার।
শফিকুলের সামনে তাই মুক্ত পৃথিবী, কিন্তু নেই সেই মানুষটি—যার জন্য একদিন তিনি রাতের অন্ধকারে ঘর ছেড়েছিলেন।
অদ্ভুতভাবে, এতকিছুর পরও পুতুলের প্রতি তার মনে নাকি কোনো ঘৃণা নেই।
তার অনুভূতি যেন এখনও সেই পুরোনো জায়গাতেই আটকে আছে—
“কাছে না পেলেও দূর থেকে দেখতে পারব তাকে। কখনো ঘৃণা করব না। ভালোবেসেছি, ভালোবেসেই যাব।”
কিন্তু ভালোবাসার পাশাপাশি বুকের ভেতর একটি প্রশ্নও রয়ে গেছে।
যে মানুষটি একদিন চিঠি লিখে তাকে নিজের কাছে ডেকেছিলেন, সেই মানুষটিই পরে আদালতে তার বিরুদ্ধে জবানবন্দি দিলেন কেন?
২৩ বছর কেটে গেছে।
প্রশ্নটি পুরোনো হয়েছে, কিন্তু উত্তরটি এখনও অজানা।
হয়তো পুতুলের কাছে তার উত্তর আছে।
হয়তো সময়ের কোনো এক মোড়ে তাদের দুজনের গল্পের এমন কিছু অধ্যায় আছে, যা শফিকুল কখনো জানতে পারেননি।
তবে আজ আর সেই উত্তর দিয়ে অতীত বদলানোর সুযোগ নেই।
একজন নিজের সংসারে।
অন্যজন ২৩ বছর পর ফিরে এসেছেন মুক্ত জীবনে।
মাঝখানে পড়ে আছে একটি চিঠি, একটি রাত, একটি ভালোবাসা আর ২৩ বছরের দীর্ঘ বিচ্ছেদ।
কিছু মানুষকে জীবন থেকে হারিয়ে ফেলা যায়, কিন্তু স্মৃতি থেকে নয়।
আর কিছু ভালোবাসা কাছে এসে পূর্ণতা পায় না—
দূরে সরে গিয়েও সারাজীবন অসমাপ্ত থেকে যায়।
শফিকুল ও পুতুলের গল্প হয়তো তেমনই এক গল্প।
যার শুরু হয়েছিল ভালোবাসায়, আর যার শেষটুকু লিখে দিয়েছে সময়।

 

সংগৃহীত