ঢাকা ১২:১৬ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ০২ অক্টোবর ২০২৬, ১৭ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

চাঁদপুর সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিস প্রকাশ্যে চলছে ঘুস বাণিজ্য

চাঁদপুর সদর উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দলিল নিবন্ধন করতে আসা সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকে সরকারি নির্ধারিত ফি-এর বাইরে দলিলপ্রতি ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত ‘অফিস খরচ’ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। একাধিক সূত্রের দাবি, এই অর্থ বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে বণ্টন করা হয়। এর পাশাপাশি দাতা ও গ্রহীতার টিপসই নেওয়ার নামে দলিল প্রতি আরও ১শ টাকা করে অতিরিক্ত নেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেছেন একাধিক সেবাগ্রহীতা।
সূত্রগুলোর দাবি, দলিল নিবন্ধনের সময় সরকারি ফি ও নির্ধারিত খরচের বাইরে বিভিন্ন নামে এসব অর্থ দিতে হয়। বিশেষ করে দলিলপ্রতি ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত ‘অফিস খরচ’ নেওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। তবে এ অর্থ কোন সরকারি খাতে নেওয়া হয়, এর কোনো অনুমোদন রয়েছে কি না এবং কারা কীভাবে এর ভাগ পান—এসব বিষয়ে কোনো স্বচ্ছ হিসাব পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে টিপসই নেওয়ার নামে অতিরিক্ত ১শ টাকা আদায়ের অভিযোগের বিষয়টি আরও গুরুতর হয়ে উঠেছে। কারণ, সেবাগ্রহীতাদের অভিযোগ অনুযায়ী, এই অর্থ নেওয়ার কার্যক্রম গোপনে নয়, বরং সাব-রেজিস্ট্রারের এজলাসের সামনেই প্রকাশ্যে করা হচ্ছে।
প্রতিবেদকের কাছে থাকা ভিডিও ফুটেজে সাব-রেজিস্ট্রারের এজলাসের সামনে বসে দলিলের দাতা ও গ্রহীতাদের টিপসই নেওয়ার পাশাপাশি অর্থ লেনদেনের দৃশ্য দেখা যায়। গত রোববার, সোমবার ও মঙ্গলবার সরেজমিনে গিয়েও এজলাসের সামনে টিপসই নেওয়ার কার্যক্রম চলতে দেখা গেছে বলে প্রতিবেদকের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে।
অভিযোগ রয়েছে, টিপসই নেওয়ার পর সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকে ১শ টাকা করে নেওয়া হয়। অফিস সহায়ক মানিক ও নাইট গার্ড বিল্লাহ হোসেনের বিরুদ্ধে এই অর্থ সংগ্রহের অভিযোগ করেছেন একাধিক সেবাগ্রহীতা।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চাঁদপুর সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে সপ্তাহে তিন দিন দলিল নিবন্ধনের কার্যক্রম পরিচালিত হয়। মাসে গড়ে প্রায় ১ হাজার থেকে ১৩শ দলিল নিবন্ধন হয়ে থাকে।
সূত্রের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রতিটি দলিলে ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা ‘অফিস খরচ’ নেওয়া হলে মাসে এর অংক দাঁড়াতে পারে আনুমানিক ২০ লাখ থেকে ৩২ লাখ ৫০ হাজার টাকা। বছরে যা প্রায় ২ কোটি ৪০ লাখ থেকে ৩ কোটি ৯০ লাখ টাকা দাঁড়ায়।
এর সঙ্গে দলিলপ্রতি অতিরিক্ত ১শ টাকা করে মাসে আরও প্রায় ১ লাখ থেকে ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা এবং বছরে প্রায় ১২ লাখ থেকে ১৫ লাখ ৬০ হাজার টাকা অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের সম্ভাবনা রয়েছে।
দলিল নিবন্ধন করতে আসা একাধিক সেবাগ্রহীতার অভিযোগ, সরকারি ফি ও অন্যান্য নির্ধারিত খরচ পরিশোধ করার পরও বিভিন্ন নামে অতিরিক্ত টাকা দিতে হয়। কেউ কেউ অভিযোগ করেছেন, এসব টাকা দিতে অনাগ্রহ প্রকাশ করলে দলিলের কাজ সম্পন্ন করতে বিলম্ব কিংবা নানা ধরনের বিড়ম্বনার আশঙ্কা থাকে। ফলে অনেকেই আপত্তি না করে বাধ্য হয়ে টাকা দেন। সেবাগ্রহীতাদের প্রশ্ন, সরকারি নির্ধারিত ফি-এর বাইরে যদি নিয়মিতভাবে ‘অফিস খরচ’ বাবদ হাজার হাজার টাকা নেওয়া হয়, তাহলে এর সরকারি ভিত্তি কী? এ অর্থের রসিদ কোথায়? হিসাবই বা কোথায় রাখা হয়?
সেবাগ্রহীতাদের দাবি, সাব-রেজিস্ট্রারের এজলাসের সামনেই নিয়মিত টিপসই নেওয়া ও টাকা সংগ্রহের ঘটনা ঘটছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে—এজলাসের সামনে এভাবে অর্থ নেওয়ার ঘটনা যদি নিয়মিত হয়ে থাকে, তাহলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে আসেনি কেন? আর নজরে এসে থাকলে তা বন্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি কেন?
অফিস সহায়ক মানিক ও নাইটগার্ড বিল্লাহ হোসেনের প্রকাশ্যে অতিরিক্ত টাকা করে নেওয়ার বিষয়ে কাছে জানতে চাইলে কেরানী শাহআলম জানান, এগুলো ছোটখাটো বিষয়, এগুলো নিয়ে ঝামেলা করার কী দরকার! এরপরও আপনাদের কোন কথা থাকলে সাব-রেজিষ্টারের সাথে কথা বলেন।
দলিলপ্রতি ১শ টাকা নেওয়ার অভিযোগ এবং তার এজলাসের সামনে অর্থ সংগ্রহের বিষয়ে চাঁদপুর সদর উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রার আব্দুর রাজ্জাকের বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা টাকা নেই। অনেক মানুষই তো অনেকভাবে টাকা নেয়। আমরা টাকা নিলে সমস্যা কোথায়? আর আমাদেরও তো বিভিন্ন জায়গায় টাকা দিতে হয়। এ বিষয়গুলো অফিসের কেরানী শাহআলম দেখেন। তিনি সব মেইন্টেন করেন। আপনারা তার সাথে কথা বলেন।
অভিযোগের বিষয়ে জেলা রেজিষ্টারের সাথে তার মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলে তার মোবাইল বন্ধ পাওয়া যায়।
সেবাগ্রহীতাদের দাবি, অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে দলিলপ্রতি ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা ‘অফিস খরচ’ এবং অতিরিক্ত ১০০ টাকা নেওয়ার অভিযোগের অর্থ কোথায় যাচ্ছে, কারা তা সংগ্রহ করছেন এবং এর সঙ্গে কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না—তা তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তারা।
চাঁদপুর সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগের প্রকৃত সত্যতা উদঘাটনে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিরপেক্ষ তদন্ত ও নথিপত্র যাচাই প্রয়োজন বলে মনে করছেন সেবাগ্রহীতারা।
ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ

মতলব ব্রিজে ছয় চাকার ট্রলির ধাক্কায় প্রাণ গেল তরুণের

চাঁদপুর সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিস প্রকাশ্যে চলছে ঘুস বাণিজ্য

আপডেট : ১১:১৪:১০ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২ অক্টোবর ২০২৬
চাঁদপুর সদর উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দলিল নিবন্ধন করতে আসা সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকে সরকারি নির্ধারিত ফি-এর বাইরে দলিলপ্রতি ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত ‘অফিস খরচ’ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। একাধিক সূত্রের দাবি, এই অর্থ বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে বণ্টন করা হয়। এর পাশাপাশি দাতা ও গ্রহীতার টিপসই নেওয়ার নামে দলিল প্রতি আরও ১শ টাকা করে অতিরিক্ত নেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেছেন একাধিক সেবাগ্রহীতা।
সূত্রগুলোর দাবি, দলিল নিবন্ধনের সময় সরকারি ফি ও নির্ধারিত খরচের বাইরে বিভিন্ন নামে এসব অর্থ দিতে হয়। বিশেষ করে দলিলপ্রতি ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত ‘অফিস খরচ’ নেওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। তবে এ অর্থ কোন সরকারি খাতে নেওয়া হয়, এর কোনো অনুমোদন রয়েছে কি না এবং কারা কীভাবে এর ভাগ পান—এসব বিষয়ে কোনো স্বচ্ছ হিসাব পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে টিপসই নেওয়ার নামে অতিরিক্ত ১শ টাকা আদায়ের অভিযোগের বিষয়টি আরও গুরুতর হয়ে উঠেছে। কারণ, সেবাগ্রহীতাদের অভিযোগ অনুযায়ী, এই অর্থ নেওয়ার কার্যক্রম গোপনে নয়, বরং সাব-রেজিস্ট্রারের এজলাসের সামনেই প্রকাশ্যে করা হচ্ছে।
প্রতিবেদকের কাছে থাকা ভিডিও ফুটেজে সাব-রেজিস্ট্রারের এজলাসের সামনে বসে দলিলের দাতা ও গ্রহীতাদের টিপসই নেওয়ার পাশাপাশি অর্থ লেনদেনের দৃশ্য দেখা যায়। গত রোববার, সোমবার ও মঙ্গলবার সরেজমিনে গিয়েও এজলাসের সামনে টিপসই নেওয়ার কার্যক্রম চলতে দেখা গেছে বলে প্রতিবেদকের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে।
অভিযোগ রয়েছে, টিপসই নেওয়ার পর সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকে ১শ টাকা করে নেওয়া হয়। অফিস সহায়ক মানিক ও নাইট গার্ড বিল্লাহ হোসেনের বিরুদ্ধে এই অর্থ সংগ্রহের অভিযোগ করেছেন একাধিক সেবাগ্রহীতা।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চাঁদপুর সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে সপ্তাহে তিন দিন দলিল নিবন্ধনের কার্যক্রম পরিচালিত হয়। মাসে গড়ে প্রায় ১ হাজার থেকে ১৩শ দলিল নিবন্ধন হয়ে থাকে।
সূত্রের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রতিটি দলিলে ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা ‘অফিস খরচ’ নেওয়া হলে মাসে এর অংক দাঁড়াতে পারে আনুমানিক ২০ লাখ থেকে ৩২ লাখ ৫০ হাজার টাকা। বছরে যা প্রায় ২ কোটি ৪০ লাখ থেকে ৩ কোটি ৯০ লাখ টাকা দাঁড়ায়।
এর সঙ্গে দলিলপ্রতি অতিরিক্ত ১শ টাকা করে মাসে আরও প্রায় ১ লাখ থেকে ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা এবং বছরে প্রায় ১২ লাখ থেকে ১৫ লাখ ৬০ হাজার টাকা অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের সম্ভাবনা রয়েছে।
দলিল নিবন্ধন করতে আসা একাধিক সেবাগ্রহীতার অভিযোগ, সরকারি ফি ও অন্যান্য নির্ধারিত খরচ পরিশোধ করার পরও বিভিন্ন নামে অতিরিক্ত টাকা দিতে হয়। কেউ কেউ অভিযোগ করেছেন, এসব টাকা দিতে অনাগ্রহ প্রকাশ করলে দলিলের কাজ সম্পন্ন করতে বিলম্ব কিংবা নানা ধরনের বিড়ম্বনার আশঙ্কা থাকে। ফলে অনেকেই আপত্তি না করে বাধ্য হয়ে টাকা দেন। সেবাগ্রহীতাদের প্রশ্ন, সরকারি নির্ধারিত ফি-এর বাইরে যদি নিয়মিতভাবে ‘অফিস খরচ’ বাবদ হাজার হাজার টাকা নেওয়া হয়, তাহলে এর সরকারি ভিত্তি কী? এ অর্থের রসিদ কোথায়? হিসাবই বা কোথায় রাখা হয়?
সেবাগ্রহীতাদের দাবি, সাব-রেজিস্ট্রারের এজলাসের সামনেই নিয়মিত টিপসই নেওয়া ও টাকা সংগ্রহের ঘটনা ঘটছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে—এজলাসের সামনে এভাবে অর্থ নেওয়ার ঘটনা যদি নিয়মিত হয়ে থাকে, তাহলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে আসেনি কেন? আর নজরে এসে থাকলে তা বন্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি কেন?
অফিস সহায়ক মানিক ও নাইটগার্ড বিল্লাহ হোসেনের প্রকাশ্যে অতিরিক্ত টাকা করে নেওয়ার বিষয়ে কাছে জানতে চাইলে কেরানী শাহআলম জানান, এগুলো ছোটখাটো বিষয়, এগুলো নিয়ে ঝামেলা করার কী দরকার! এরপরও আপনাদের কোন কথা থাকলে সাব-রেজিষ্টারের সাথে কথা বলেন।
দলিলপ্রতি ১শ টাকা নেওয়ার অভিযোগ এবং তার এজলাসের সামনে অর্থ সংগ্রহের বিষয়ে চাঁদপুর সদর উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রার আব্দুর রাজ্জাকের বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা টাকা নেই। অনেক মানুষই তো অনেকভাবে টাকা নেয়। আমরা টাকা নিলে সমস্যা কোথায়? আর আমাদেরও তো বিভিন্ন জায়গায় টাকা দিতে হয়। এ বিষয়গুলো অফিসের কেরানী শাহআলম দেখেন। তিনি সব মেইন্টেন করেন। আপনারা তার সাথে কথা বলেন।
অভিযোগের বিষয়ে জেলা রেজিষ্টারের সাথে তার মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলে তার মোবাইল বন্ধ পাওয়া যায়।
সেবাগ্রহীতাদের দাবি, অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে দলিলপ্রতি ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা ‘অফিস খরচ’ এবং অতিরিক্ত ১০০ টাকা নেওয়ার অভিযোগের অর্থ কোথায় যাচ্ছে, কারা তা সংগ্রহ করছেন এবং এর সঙ্গে কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না—তা তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তারা।
চাঁদপুর সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগের প্রকৃত সত্যতা উদঘাটনে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিরপেক্ষ তদন্ত ও নথিপত্র যাচাই প্রয়োজন বলে মনে করছেন সেবাগ্রহীতারা।