নিজেদের বেতনের টাকা থেকে নিয়মিত চাঁদা জমা দিয়েছেন। প্রত্যাশা ছিল, চাকরি শেষে অবসরে গেলে সমিতি থেকে জমাকৃত অর্থ ও লভ্যাংশ পাবেন। কিন্তু সেই প্রত্যাশা পূরণ হচ্ছে না চাঁদপুর কালেক্টরেট কর্মকর্তা-কর্মচারী বহুমুখী সমবায় সমিতি লিমিটেডের সদস্যেদের । ২০২১ সালে জমাকৃত অর্থ ফেরত চেয়ে আবেদন করেও এখন পর্যন্ত টাকা পাননি কয়েকজন অবসরপ্রাপ্ত সদস্য। অথচ ২০২৪ সালের হিসাব অনুযায়ী, সমিতির নামে দুটি ব্যাংকে ৪৪ লাখ ৬৫ হাজার টাকা স্থায়ী আমানত (এফডিআর) হিসেবে জমা ছিল। এর বাইরে সমিতির আয়ের উৎস হিসেবে রয়েছে ২০টি দোকানের একটি মার্কেট। কিন্তু সেই মার্কেট থেকে কত টাকা ভাড়া আদায় হচ্ছে, সেলামি বাবদ কত টাকা পাওয়া গেছে এবং আয়-ব্যয়ের হিসাব কী—এসব বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য দিতে পারছেন না সমিতির সাধারণ সম্পাদকও।
ব্যাংকে লাখ লাখ টাকা জমা, আয়ের উৎস হিসেবে মার্কেট থাকা এবং সদস্যদের পাওনা ফেরত না পাওয়ার এই পরিস্থিতিতে সমিতির আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সদস্যদের জমাকৃত অর্থের বর্তমান অবস্থা কী, মার্কেটের আয় কোথায় যাচ্ছে এবং পাওনা পরিশোধে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না কেন—এসব প্রশ্নের উত্তর চান ভুক্তভোগীরা।
২০১১ সালে প্রতিষ্ঠিত এ সমিতির নিবন্ধন নম্বর গভঃ রেজিঃ নং ৯৮/চাঁদ/২০১১। সমিতির মোট সদস্য ১৪০ জন। তাঁদের মধ্যে সাতজন মারা গেছেন এবং ৪৮ জন অবসরে গেছেন বলে জানা গেছে। দীর্ঘদিন ধরে সমিতির চাঁদা সংগ্রহও বন্ধ রয়েছে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের হিসাবে সমিতির নামে এবি ব্যাংকে ২৮ লাখ ১৩ হাজার টাকা এবং অগ্রণী ব্যাংকে ১৬ লাখ ৫২ হাজার টাকা এফডিআর হিসেবে জমা ছিল। দুই ব্যাংকে মোট অর্থের পরিমাণ ৪৪ লাখ ৬৫ হাজার টাকা।
অন্যদিকে, সমিতির সদস্য অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নির্মল চন্দ্র মজুমদার, রশিদা খাতুন ও মোস্তফা মজুমদার ২০২১ সালে তাঁদের জমাকৃত অর্থ লভ্যাংশসহ ফেরত চেয়ে আবেদন করেন বলে জানা গেছে। তবে এখন পর্যন্ত তাঁরা টাকা ফেরত পাননি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। শুধু এই তিনজনই নন, আরও কয়েকজন সদস্য তাঁদের জমাকৃত অর্থ ফেরত চেয়েও পাননি বলে জানা গেছে।
সদস্যদের অভিযোগ, তাঁরা শুধু নিজেদের জমাকৃত অর্থই ফেরত পাচ্ছেন না, সমিতির আয়-ব্যয়ের পূর্ণাঙ্গ হিসাবও জানতে পারছেন না।
এখানেই দেখা দিয়েছে বড় প্রশ্ন—সমিতির ব্যাংকে জমা অর্থের বর্তমান পরিমাণ কত, সদস্যদের মোট পাওনা কত এবং তাঁদের টাকা ফেরত দিতে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে? ২০২৪ সালের ব্যাংক স্থিতির পরবর্তী অবস্থা, এফডিআর ও অন্যান্য হিসাবের বিবরণ এবং সদস্যভিত্তিক পাওনার তালিকা প্রকাশ করা হলে সমিতির প্রকৃত আর্থিক চিত্র পরিষ্কার হতো।
সমিতির আয়ের অন্যতম উৎস হিসেবে চাঁদপুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের পাশে প্রায় পাঁচ শতাংশ খাসজমিতে একটি মার্কেট নির্মাণ করা হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, তৎকালীন জেলা প্রশাসক আঞ্জনা খান মজলিশের উদ্যোগে মার্কেটটি নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। মার্কেটটিতে ২০টি দোকান রয়েছে বলে জানা গেছে। মার্কেট নির্মাণে কালেক্টরেট মসজিদের ইমাম ও মুহাদ্দিস মোশাররফ হোসেন ৪২ লাখ ৪৩ হাজার ১০৬ টাকা ব্যয় করেছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। তিনি সমিতির সদস্য নন। বর্তমানে মার্কেটটির আয়-ব্যয়ের হিসাব তাঁর কাছে রয়েছে বলে সমিতি-সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, মার্কেটের আয়ের ৪০ শতাংশ সমিতি এবং ৬০ শতাংশ মোশাররফ হোসেন পাবেন—এমন একটি হিসাব রয়েছে। কিন্তু এই অর্থ বণ্টনের শর্ত কী, নির্মাণব্যয়ের বিপরীতে কত টাকা পরিশোধ হয়েছে এবং কত বছর পর্যন্ত তিনি আয়ের ৬০ শতাংশ পাবেন, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।
মার্কেটের দোকানভাড়া থেকে মাসে কত টাকা আদায় হচ্ছে, বছরে মোট আয় কত এবং সমিতির হিসাবে কত টাকা জমা হচ্ছে—এসব তথ্যও স্পষ্ট নয়। ফলে সমিতির আয়ের অন্যতম উৎস হওয়া সত্ত্বেও মার্কেটটির আর্থিক ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া যাচ্ছে না।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, মার্কেটের প্রতিটি দোকান বরাদ্দের সময় দেড় লাখ থেকে পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত সেলামি নেওয়া হয়েছে। তবে ২০টি দোকান থেকে মোট কত টাকা আদায় হয়েছে, সেই অর্থের কত অংশ সমিতির হিসাবে জমা রয়েছে এবং কত টাকা নির্মাণব্যয়ের সঙ্গে সমন্বয় করা হয়েছে, তার পূর্ণাঙ্গ হিসাব পাওয়া যায়নি।
সমিতির সাধারণ সম্পাদক মজিবুর রহমানের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দোকানগুলো এ, বি ও সি—এই তিন ক্যাটাগরিতে ভাগ করা হয়েছে। এ ক্যাটাগরির দোকানের মাসিক ভাড়া পাঁচ হাজার, বি ক্যাটাগরির চার হাজার এবং সি ক্যাটাগরির তিন হাজার ৫০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাস্তবে এ ক্যাটাগরির দোকান থেকে মাসে সাত হাজার ৫০০ টাকা এবং সি ক্যাটাগরির দোকান থেকে চার হাজার টাকা ভাড়া নেওয়া হচ্ছে। নির্ধারিত ভাড়া ও বাস্তবে আদায় করা ভাড়ার এই পার্থক্যের কারণে মার্কেটের প্রকৃত আয় নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
দোকানভিত্তিক ভাড়ার তালিকা, ভাড়াটিয়াদের সঙ্গে চুক্তি, সেলামি আদায়ের রসিদ এবং আয় জমার ব্যাংক হিসাব যাচাই করা হলে মার্কেটের প্রকৃত আর্থিক চিত্র জানা সম্ভব হবে। কিন্তু এসব নথির ভিত্তিতে পূর্ণাঙ্গ হিসাব প্রকাশ না হওয়ায় সমিতির সদস্যদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে।
সমিতির সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান বলেন, “আমাদের অনেক সদস্য মারা গেছেন। কিছু সদস্য বেঁচে আছেন। সমিতির আয়-ব্যয়ের হিসাবের জন্য জেলা প্রশাসক স্যারকে বলেছি। স্যার উদ্যোগ না নিলে আমরা কী করতে পারি?”
মার্কেটের দোকানসংখ্যা, মাসিক ভাড়া, সেলামির মোট পরিমাণ, নির্মাণব্যয়ের বিপরীতে কত টাকা পরিশোধ হয়েছে এবং কত বছর ধরে মোশাররফ হোসেন আয়ের ৬০ শতাংশ পাবেন—এসব বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি সুনির্দিষ্ট তথ্য দিতে পারেননি। এসব তথ্য মোশাররফ হোসেনের কাছ থেকে জেনে নিতে হবে বলে জানান তিনি।
সমিতির সাধারণ সম্পাদকই যখন আয়ের অন্যতম উৎস মার্কেটের পূর্ণাঙ্গ হিসাব দিতে পারছেন না, তখন সদস্যদের জমাকৃত অর্থ ও সমিতির সামগ্রিক আর্থিক অবস্থার চিত্র কীভাবে নিশ্চিত করা হচ্ছে, সে প্রশ্ন উঠেছে।
জানা গেছে, ২০২৫ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর জেলা প্রশাসক সমিতির বিষয়ে একটি সভা আহ্বান করেছিলেন। তবে অনিবার্য কারণ দেখিয়ে সভাটি অনুষ্ঠিত হয়নি। এরপর সমিতির ব্যাংক হিসাব, মার্কেটের আয়-ব্যয় ও সদস্যদের পাওনা নিষ্পত্তিতে কী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা স্পষ্ট নয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন অবসরপ্রাপ্ত সদস্য বলেন, দীর্ঘ কর্মজীবনে তাঁরা সমিতিতে চাঁদা দিয়েছেন। কিন্তু অবসরে যাওয়ার পরও নিজেদের জমাকৃত অর্থ ফেরত পাচ্ছেন না। তাঁদের দাবি, জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে সভা করে সমিতির সব আর্থিক হিসাব প্রকাশ এবং সদস্যদের পাওনা পরিশোধের ব্যবস্থা করা হোক।
এ বিষয়ে চাঁদপুরের জেলা প্রশাসক আহমেদ জিয়াউর রহমান বলেন, “এই বিষয়টি আমি কিছুদিন আগে জেনেছি। আমি তাঁদের কাগজপত্র ও ফাইল আমাকে দেওয়ার জন্য বলেছি। আয়-ব্যয়ের বিষয়টি তাঁদেরই। আমি এখানে পদাধিকারবলে সভাপতি হয়েছি। আমরা বিষয়টি নিয়ে কাজ করব।”
চাঁদপুর কালেক্টরেট কর্মকর্তা-কর্মচারী বহুমুখী সমবায় সমিতির আর্থিক অবস্থার স্বচ্ছ চিত্র পেতে ব্যাংকের এফডিআর ও অন্যান্য হিসাব, সদস্যদের জমা ও পাওনার তালিকা, মার্কেটের নির্মাণব্যয়ের নথি, দোকান বরাদ্দের সেলামি, মাসিক ভাড়া এবং আয় বণ্টনের হিসাব একসঙ্গে যাচাই করা প্রয়োজন।
বিশেষ করে ২০২৪ সালের ব্যাংক স্থিতির পরবর্তী অবস্থা, সমিতির মোট দায়-দেনা, সদস্যদের পাওনা পরিশোধ না করার কারণ এবং মার্কেটের আয় থেকে সমিতির হিসাবে জমা হওয়া অর্থের পরিমাণ প্রকাশ করা জরুরি। একই সঙ্গে সমিতির ব্যবস্থাপনা কমিটির কাছে এসব হিসাব নিয়মিত উপস্থাপন করা হয় কি না, তাও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
সমিতির অর্থ ও সম্পদের প্রকৃত হিসাব প্রকাশ, নিরপেক্ষ আর্থিক নিরীক্ষা এবং অবসরপ্রাপ্ত সদস্যদের পাওনা নিষ্পত্তিতে কার্যকর উদ্যোগ—এখন এটাই সংশ্লিষ্ট সদস্যদের দাবি।



















