২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। এ দিন ভাষা আন্দোলনে নিহত শহিদদের স্মরণে নির্মিত নারায়ণগঞ্জের চাষাঢ়া কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। এ জন্য আগের দিন থেকে স্থানীয় প্রশাসন নানা আয়োজন করে থাকে।
তবে শুধু এই দিনটি ছাড়া বছরের বাকি দিনগুলোতে জুতা পায়ে দিয়ে শহিদ মিনারের বেদিতে বসে আড্ডা যেন স্বাভাবিক ঘটনা। এমনকি রাতে শহিদ মিনারের পেছনে বসে মাদকসেবীদের আড্ডা আর ছিনতাইকারীদের টাকা ভাগাভাগি নিয়ে প্রায় চলে মারামারির ঘটনা। এ ছাড়া রাজনৈতিক বিভিন্ন নেতার বিরুদ্ধে জুতা পায়ে দিয়ে শহিদ মিনারে উঠে বক্তব্য দেওয়ার চিত্র বহু দেখা গেছে।
গত শুক্র ও শনিবারও একই চিত্র দেখা যায় নারায়ণগঞ্জের কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে। এ দিন মানুষের সমাগম বেশি থাকায় শহিদ মিনারের বেদি ও চারপাশে বেড়ে যায় অপরিচ্ছন্নতা। শহিদ মিনারের সিঁড়ি ও বেদিতে জুতা পায়ে দিয়ে অনেক নারী-পুরুষকে বসে আড্ডা দিতে দেখা যায়। আর শহিদ মিনার প্রাঙ্গণ ছিল চটপটি ও ফুচকার দোকানিদের দখলে।
নিয়মিত শহিদ মিনারে আসা আহমেদ সাব্বির নামে এক চিত্রগ্রাহক বলেন, ‘সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত শহিদ মিনারের বেদিতে বসে বহু মানুষ আড্ডা দেন। তার মধ্যে সকালে বিভিন্ন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীও রয়েছে। প্রায় সবাই জুতা পরে বেদিতে বসে থাকেন। আমি নিজেও বহুবার বহুজনকে বলেছি জুতা খোলার জন্য। কিন্তু কে শোনে কার কথা।’
প্রায় রাতে শহিদ মিনারের পেছনে গণ্ডগোল হয় জানিয়ে আব্দুল্লাহ সরকার নামে স্থানীয় পত্রিকার এক সাংবাদিক বলেন, ‘সপ্তাহে অন্তত চার দিন শহিদ মিনারের পেছনে মাদকসেবীরা মারামারি করে। সন্ধ্যা নামার পরপরই তারা আড্ডায় মেতে ওঠে। এমনকি এখানে আসা নারীদেরও তারা নানা অশ্লীল ভাষায় মন্তব্য করে। কেউ প্রতিবাদ করতে গেলে সবাই মিলে তার ওপর চড়াও হয়। অথচ পুলিশ শহিদ মিনারের বাইরে গাড়ি নিয়ে বসে থাকে। কিন্তু তারা এ নিয়ে তেমন কোনো ব্যবস্থাই নেয় না।’
মধ্যরাতে আবার ছিনতাইকারীরা শহিদ মিনারের পাশে বসে ছিনতাই করা মালপত্র ভাগাভাগি করে বলে জানান প্রত্যক্ষদর্শী ইমরান হোসেন লিয়ন নামের এক সিএনজিচালক। তিনি বলেন, ‘রাতে শহিদ মিনারের এখান থেকে যাত্রী নিয়ে ঢাকার দিকে যাই। প্রায় সময়ই দেখি শহিদ মিনারের বেদিতে কিছু লোকজন বসে থাকে। ওই লোকজনের মধ্যে কারও কারও গ্রেপ্তারের ছবি আগেই পত্রিকায় দেখেছিলাম।’
একদল অসচেতন ব্যক্তি জুতা পায়ে দিয়ে শহিদ মিনারের বেদিতে উঠে তাদের অজ্ঞতার পরিচয় দেয় বলে জানান নারায়ণগঞ্জের সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি ভবানী শংকর রায়। তিনি বলেন, ‘এখানে শহিদ মিনারে জুতা পায়ে অহরহ লোকজন উঠে যায়। এটা খুবই দুঃখজনক। স্কুল-কলেজের ছেলেমেয়ে থেকে শুরু করে বিভিন্ন বয়সের নারী-পুরুষও জুতা পায়ে দিয়ে উঠে আড্ডা দিচ্ছেন।’
রাজনৈতিক নেতারাও শহিদ মিনারের পবিত্রতা নষ্ট করছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘অনেক রাজনৈতিক নেতাও বক্তব্য দেওয়ার সময় জুতা পায়ে দিয়ে শহিদ মিনারে উঠে যান। এটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এটা রীতিমতো অপরাধ বলা চলে।’
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) জেলা সভাপতি ধীমান সাহা জুয়েল বলেন, ‘শহিদ মিনার আমাদের একটা বেদনা ও আবেগের জায়গা। শহিদ মিনারে পবিত্রতা নষ্ট করা থেকে শুরু করে অনাকাঙ্ক্ষিত লোকের প্রবেশ করে বিশৃঙ্খলা করে। এমনকি মাদক ব্যবসা পর্যন্ত হয়। ফলে এসব প্রতিরোধে একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তিকে নিয়োগ দেওয়ার জন্য সিটি করপোরেশনের কাছে আমরা দাবি জানিয়েছিলাম। তবে এটা করেনি। প্রশাসনও ব্যবস্থা নেয়নি।’
‘এ নগরীর আদর্শ নাগরিক ফাউন্ডেশনের’ সভাপতি ইকবাল হোসাইন জানান, শহিদ মিনার একটি পবিত্র স্থান। এখানে নেশাখোর-ছিনতাইকারীসহ নানা অপরাধী সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশে থাকে। দিন-রাতে আড্ডাবাজি থেকে শুরু করে মেয়েদের ইভ টিজিং করে থাকে। এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য প্রশাসনের কাছে দাবি জানাই।
বিষয়টি নিয়ে জানতে শহিদ মিনারের দেখভালের দায়িত্বে থাকা নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ জাকির হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি খবরের কাগজকে জানান, তাদের পক্ষ থেকে এখানে শুধু পরিচ্ছন্নকর্মীরা কাজ করেন। তবে শহিদ মিনারের বেদিসহ চারপাশ রক্ষণাবেক্ষণে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি বলেন, শহিদ মিনারে জুতা নিয়ে না ওঠার ব্যাপারে কঠোর নির্দেশনা রয়েছে। পাশাপাশি পুলিশ বা জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
শহিদ মিনারের ভেতরে যারা বিশৃঙ্খলা করবে তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়ে সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘এখানে আমাদের টহল টিম নিয়মিত কাজ করে। তবুও শহিদ মিনারের পেছনে বা ভেতরে কোনো বিশৃঙ্খলা বা আইনবিরোধী কর্মকাণ্ড করলে তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।’
এ বিষয়ে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হবে বলে জানিয়েছেন জেলার অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মৌসুমি হীরা বাইন। তিনি বলেন, ‘যদি এমনটা হয়ে থাকে, তাহলে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে আইন ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি স্কুল-কলেজের শিক্ষক ও অভিভাবকদেরও এ বিষয়ে শিক্ষার্থীদের সচেতন করা প্রয়োজন।’ তাদের সন্তান কোথায় থাকে সে খোঁজখবরও নেওয়া উচিত বলে মনে করেন তিনি।




















