চাঁদপুরের হাজীগঞ্জ পৌরসভার সরবরাহ করা পানি নিয়ে দিন দিন বাড়ছে জনঅসন্তোষ ও উদ্বেগ। বিশুদ্ধ পানির পরিবর্তে অনেক এলাকায় কালচে, দুর্গন্ধযুক্ত ও ময়লাযুক্ত পানি সরবরাহ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন পৌরবাসী। স্থানীয়দের ভাষায়, “এ পানি যেন পানি নয়, বিষ।” দীর্ঘদিন ধরে এমন পরিস্থিতি চললেও কার্যকর সমাধান না হওয়ায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন সাধারণ মানুষ।
পৌরসভার বিভিন্ন ওয়ার্ডের বাসিন্দারা জানান, বাসাবাড়ির কল খুললেই অনেক সময় আলকাতরার মতো কালো পানি বের হচ্ছে। কোথাও কোথাও পানিতে দুর্গন্ধ ও ময়লার উপস্থিতিও দেখা যাচ্ছে। রান্না, খাওয়া কিংবা দৈনন্দিন ব্যবহারের জন্য এ পানি অনুপযোগী হয়ে পড়েছে বলে দাবি তাদের।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এই পানি পান করে অনেকে ডায়রিয়া, টাইফয়েডসহ পানিবাহিত নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। এছাড়া গোসল ও অন্যান্য কাজে পানি ব্যবহার করে শিশু, নারী ও বৃদ্ধসহ অনেকের শরীরে চুলকানি, এলার্জি ও বিভিন্ন ধরনের চর্মরোগ দেখা দিচ্ছে। কেউ কেউ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হচ্ছেন বলেও জানা গেছে।
অথচ হাজীগঞ্জ পৌরসভার সারফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টটি প্রায় ১২ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত একটি অত্যাধুনিক ভূপৃষ্ঠস্থ পানি শোধনাগার। ২০২১ সালের জুন মাসে আনুষ্ঠানিকভাবে প্ল্যান্টটির কার্যক্রম শুরু হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, প্ল্যান্টটি থেকে পৌর এলাকার প্রায় ৪০ হাজার নাগরিক ও ৮ হাজার পরিবারকে নিরবচ্ছিন্নভাবে বিশুদ্ধ খাবার পানি সরবরাহের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল।
এই প্রকল্পের আওতায় পুরো পৌরসভায় প্রায় ৩১ কিলোমিটার পাইপলাইন স্থাপন করা হয়। প্ল্যান্টটির দৈনিক উৎপাদন ক্ষমতা ৪৩ লক্ষ ২০ হাজার লিটার সুপেয় পানি। এছাড়া আগামী ২০ বছর পর্যন্ত পৌরবাসীর বিশুদ্ধ পানির চাহিদা পূরণে সক্ষম বলেও দাবি করা হয়েছিল। প্রকল্পটি চালুর মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ আর্সেনিক ও অন্যান্য দূষিত পানির পরিবর্তে নদীর পানি পরিশোধন করে সরবরাহ করার কথা জানানো হয়।
তবে বাস্তব চিত্র ভিন্ন বলে অভিযোগ পৌরবাসীর। তাদের প্রশ্ন, অত্যাধুনিক ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট থাকা সত্ত্বেও কেন মানুষ নিরাপদ পানি পাচ্ছে না? সঠিকভাবে পানি পরিশোধন হচ্ছে কিনা, নাকি অপরিশোধিত বা আংশিক পরিশোধিত নদীর পানি সরাসরি পাইপলাইনের মাধ্যমে সরবরাহ করা হচ্ছে—এ নিয়েই এখন দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক বাসিন্দা বলেন, “পানির রং এতটাই কালো যে রান্না করতে ভয় লাগে। খাওয়ার তো প্রশ্নই আসে না। তারপরও বাধ্য হয়ে এই পানি ব্যবহার করতে হচ্ছে।”
আরেক বাসিন্দা বলেন, “বছরের পর বছর পানি বিল দিচ্ছি, কিন্তু বিশুদ্ধ পানি পাচ্ছি না। কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে প্ল্যান্ট তৈরি হলেও সাধারণ মানুষ তার সুফল পাচ্ছে না।”
সচেতন মহলের মতে, বিশুদ্ধ পানি মানুষের মৌলিক অধিকার। তাই দ্রুত পানির গুণগত মান পরীক্ষা, ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টের কার্যকারিতা যাচাই, পাইপলাইনের অবস্থা পর্যবেক্ষণ এবং নিরাপদ পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে জরুরি ভিত্তিতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
পৌরবাসীর দাবি, জনগণের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় অবিলম্বে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করে নিরাপদ ও বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় ভবিষ্যতে বড় ধরনের জনস্বাস্থ্য সংকট তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।




















