ঢাকা ০৬:১৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ১২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মতলব উত্তর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স আড়াই বছর ধরে সিজার বন্ধ, চিকিৎসকসংকটে ব্যাহত স্বাস্থ্যসেবা

চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসকসংকট, ওষুধের ঘাটতি ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার যন্ত্রপাতি অচল থাকায় ব্যাহত হচ্ছে চিকিৎসাসেবা। বিশেষ করে গাইনি চিকিৎসক না থাকায় প্রায় আড়াই বছর ধরে বন্ধ রয়েছে জরুরি সিজারিয়ান অস্ত্রোপচার। ফলে প্রসূতিদের বাধ্য হয়ে বেসরকারি হাসপাতালে যেতে হচ্ছে। এতে বাড়তি ব্যয়ের চাপে পড়ছেন দরিদ্র ও নিম্নআয়ের পরিবারের সদস্যরা। দীর্ঘদিন ধরে প্রয়োজনীয় সেবা না পাওয়ায় সরকারি এই হাসপাতালের ওপর মানুষের নির্ভরতাও কমছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
১৪টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত মতলব উত্তর উপজেলায় পাঁচ লক্ষাধিক মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে ২০০৮ সালে ছেংগারচর পৌরসভার বড় মরাধন এলাকায় নির্মাণ করা হয় ৩১ শয্যাবিশিষ্ট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। তবে প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও চিকিৎসক ও প্রয়োজনীয় জনবলের সংকটসহ নানা সমস্যার কারণে হাসপাতালটির বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সেবা পূর্ণাঙ্গভাবে চালু রাখা সম্ভব হচ্ছে না।
শূন্য গুরুত্বপূর্ণ পদ, ব্যাহত অস্ত্রোপচার
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে জানা গেছে, হাসপাতালে জুনিয়র কনসালট্যান্ট গাইনি, সার্জারি ও মেডিসিনের পদ শূন্য রয়েছে। প্রায় তিন মাস আগে জুনিয়র কনসালট্যান্ট অ্যানেসথেসিয়া পদে একজন চিকিৎসক নিয়োগ দেওয়া হলেও গাইনি ও সার্জারি বিশেষজ্ঞ না থাকায় অস্ত্রোপচার কার্যক্রম চালু করা সম্ভব হচ্ছে না।
হাসপাতালে আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা পদে নিয়োগ থাকলেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ডেপুটেশনে অন্যত্র কর্মরত রয়েছেন। এ ছাড়া হাসপাতালের অধীন সাবসেন্টারগুলোতে ছয়জন চিকিৎসক থাকার কথা থাকলেও কর্মরত রয়েছেন মাত্র দুজন। তাঁদের একজনও ডেপুটেশনে অন্যত্র চলে গেছেন বলে জানা গেছে।
চিকিৎসকসংকটের কারণে বিশেষ করে প্রসূতি ও জটিল রোগীদের চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হচ্ছে। জরুরি প্রসবকালীন অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হলে রোগীদের অন্য হাসপাতালে পাঠাতে হচ্ছে। এতে সময় ও অর্থ—দুই দিক থেকেই ভোগান্তিতে পড়ছেন রোগী ও তাঁদের স্বজনেরা।
হাসপাতালে রোগীর উপস্থিতি কম
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) সরেজমিনে হাসপাতালে গিয়ে তুলনামূলক কম রোগীর উপস্থিতি দেখা গেছে। জরুরি বিভাগেও তেমন ভিড় ছিল না। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রয়োজনীয় চিকিৎসক, ওষুধ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুবিধা না থাকায় অনেকেই সরকারি হাসপাতালের পরিবর্তে বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের দিকে ঝুঁকছেন।
হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা কয়েকজন রোগী ও তাঁদের স্বজনের দাবি, চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্রে দেওয়া অধিকাংশ ওষুধ হাসপাতাল থেকে পাওয়া যায় না। তাঁদের অভিযোগ, প্রায় ৯০ শতাংশ ওষুধ বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে। ফলে ১০ থেকে ১২ কিলোমিটার দূর থেকে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের অতিরিক্ত সময় ও অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।
শীতের প্রভাবে জ্বর ও ঠান্ডাজনিত রোগীর সংখ্যা বাড়লেও পর্যাপ্ত চিকিৎসক না থাকায় সেবা পেতে সমস্যার মুখে পড়তে হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন কেউ কেউ। পাশাপাশি হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের খাবারের মান নিয়েও অসন্তোষ জানিয়েছেন রোগী ও তাঁদের স্বজনেরা।
সিজার করাতে গিয়ে বাড়তি ব্যয়ের চাপ
উপজেলার মিঠুর কান্দি এলাকা থেকে বোনকে নিয়ে হাসপাতালে এসেছিলেন হামিদুর রহমান। তিনি বলেন, “আমার বোনের সন্তান হবে। ব্যথা উঠলে আমরা তাকে হাসপাতালে নিয়ে আসি। এসে জানতে পারি, এখানে অপারেশনের কোনো ব্যবস্থা নেই। তারা আমাদের অন্য হাসপাতালে যেতে বলেন। পরে ছেংগারচরে একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে অপারেশন করাই।”
স্থানীয়দের ভাষ্য, গাইনি চিকিৎসক না থাকায় দীর্ঘদিন ধরে জরুরি সিজারিয়ান অস্ত্রোপচার বন্ধ থাকায় প্রসূতিদের চিকিৎসার জন্য বিকল্প প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। সরকারি হাসপাতালে স্বল্প খরচে চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ না থাকায় বিশেষ করে দরিদ্র ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারগুলো আর্থিক সংকটে পড়ছে।
এর আগে ছেংগারচরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের পর বিল পরিশোধ করতে না পেরে সন্তান বিক্রির অভিযোগ ওঠে। ঘটনাটি সে সময় সংবাদমাধ্যমে আলোচনার জন্ম দেয়। এমন পরিস্থিতিতে সরকারি হাসপাতালে জরুরি প্রসূতিসেবা চালু রাখার প্রয়োজনীয়তা আরও গুরুত্ব পাচ্ছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
অচল পরীক্ষা-নিরীক্ষার যন্ত্রপাতি
শুধু অস্ত্রোপচার নয়, হাসপাতালের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সেবাও ব্যাহত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, কয়েক মাস ধরে প্যাথলজি বিভাগের কার্যক্রম কার্যত বন্ধ রয়েছে। আলট্রাসনোগ্রাফি মেশিন নষ্ট হয়ে পড়ে আছে। কয়েক বছর ধরে বন্ধ রয়েছে এক্স-রে সেবাও।
ফলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাতে রোগীদের বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে যেতে হচ্ছে। এতে সরকারি প্রতিষ্ঠানে কম খরচে চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়েছে। সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন দরিদ্র ও নিম্নআয়ের মানুষ।
স্থানীয়দের অভিযোগ, গাইনি চিকিৎসকের পদে নিয়োগ থাকলেও সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক বর্তমানে ঢাকার পিজি হাসপাতালে ডেপুটেশনে কর্মরত রয়েছেন। এ ছাড়া ওষুধের ঘাটতি এবং চিকিৎসকদের সময়মতো কর্মস্থলে উপস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তাঁরা।
তদারকি বাড়ানোর দাবি
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, হাসপাতালের চিকিৎসক ও প্রয়োজনীয় জনবলসংকট দ্রুত সমাধানের পাশাপাশি ওষুধ সরবরাহ এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষার যন্ত্রপাতি সচল করার উদ্যোগ নিতে হবে। চিকিৎসকদের নির্ধারিত সময়ে উপস্থিতি ও দায়িত্ব পালনের বিষয়েও নিয়মিত তদারকি প্রয়োজন। কোনো অনিয়ম পাওয়া গেলে তদন্তের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
তাঁদের আশঙ্কা, দীর্ঘদিন ধরে এসব সমস্যার সমাধান না হলে হাসপাতালটির ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা আরও কমবে। এতে উপজেলার বিপুলসংখ্যক মানুষ সরকারি স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বেন।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
মতলব উত্তর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. রাজন চন্দ্র দাস বলেন, গাইনি চিকিৎসক না থাকায় জরুরি সিজারিয়ান অস্ত্রোপচার বন্ধ রয়েছে। চিকিৎসকসংকটের বিষয়টি জানিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে একাধিকবার লিখিতভাবে আবেদন করা হয়েছে। সমস্যা সমাধানে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস পাওয়া গেলেও এখন পর্যন্ত কার্যকর সমাধান হয়নি।
তিনি বলেন, “আমাদের চিকিৎসাসেবা ভালোই চলছে। তবে একাধিক পদ শূন্য থাকায় আগের মতো সেবা দিতে পারছি না।” জনবলসংকটের মধ্যেও সামর্থ্যের সর্বোচ্চটুকু দিয়ে চিকিৎসাসেবা চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন বলে জানান তিনি।
চিকিৎসকদের সময়মতো উপস্থিতি ও দায়িত্ব পালনে অবহেলার অভিযোগ প্রসঙ্গে ডা. রাজন চন্দ্র দাস বলেন, নির্ধারিত সময়ে দায়িত্ব পালনের বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। কোনো চিকিৎসক সময়মতো হাসপাতালে উপস্থিত না থাকলে বা দায়িত্বে অবহেলা করলে বিষয়টি তদন্ত ও যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
হাসপাতালের ওষুধ, অন্যান্য সেবার ঘাটতি ও জনবলসংকটের বিষয়েও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে বলে জানান তিনি।
এখন প্রশ্ন, পাঁচ লক্ষাধিক মানুষের স্বাস্থ্যসেবার গুরুত্বপূর্ণ এই প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসকসংকট, অচল যন্ত্রপাতি ও জরুরি প্রসূতিসেবার ঘাটতি দূর করে কবে স্বাভাবিক চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা হবে? স্থানীয়দের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নিয়ে হাসপাতালটির সেবার মান উন্নত করবে।

ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ

কচুয়ায় হাটের সরকারি জায়গা ও শেড দখল করে দোকান নির্মাণের অভিযোগ, থানায় অভিযোগ

মতলব উত্তর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স আড়াই বছর ধরে সিজার বন্ধ, চিকিৎসকসংকটে ব্যাহত স্বাস্থ্যসেবা

আপডেট : ০৩:৫৮:৫৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬

চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসকসংকট, ওষুধের ঘাটতি ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার যন্ত্রপাতি অচল থাকায় ব্যাহত হচ্ছে চিকিৎসাসেবা। বিশেষ করে গাইনি চিকিৎসক না থাকায় প্রায় আড়াই বছর ধরে বন্ধ রয়েছে জরুরি সিজারিয়ান অস্ত্রোপচার। ফলে প্রসূতিদের বাধ্য হয়ে বেসরকারি হাসপাতালে যেতে হচ্ছে। এতে বাড়তি ব্যয়ের চাপে পড়ছেন দরিদ্র ও নিম্নআয়ের পরিবারের সদস্যরা। দীর্ঘদিন ধরে প্রয়োজনীয় সেবা না পাওয়ায় সরকারি এই হাসপাতালের ওপর মানুষের নির্ভরতাও কমছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
১৪টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত মতলব উত্তর উপজেলায় পাঁচ লক্ষাধিক মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে ২০০৮ সালে ছেংগারচর পৌরসভার বড় মরাধন এলাকায় নির্মাণ করা হয় ৩১ শয্যাবিশিষ্ট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। তবে প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও চিকিৎসক ও প্রয়োজনীয় জনবলের সংকটসহ নানা সমস্যার কারণে হাসপাতালটির বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সেবা পূর্ণাঙ্গভাবে চালু রাখা সম্ভব হচ্ছে না।
শূন্য গুরুত্বপূর্ণ পদ, ব্যাহত অস্ত্রোপচার
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে জানা গেছে, হাসপাতালে জুনিয়র কনসালট্যান্ট গাইনি, সার্জারি ও মেডিসিনের পদ শূন্য রয়েছে। প্রায় তিন মাস আগে জুনিয়র কনসালট্যান্ট অ্যানেসথেসিয়া পদে একজন চিকিৎসক নিয়োগ দেওয়া হলেও গাইনি ও সার্জারি বিশেষজ্ঞ না থাকায় অস্ত্রোপচার কার্যক্রম চালু করা সম্ভব হচ্ছে না।
হাসপাতালে আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা পদে নিয়োগ থাকলেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ডেপুটেশনে অন্যত্র কর্মরত রয়েছেন। এ ছাড়া হাসপাতালের অধীন সাবসেন্টারগুলোতে ছয়জন চিকিৎসক থাকার কথা থাকলেও কর্মরত রয়েছেন মাত্র দুজন। তাঁদের একজনও ডেপুটেশনে অন্যত্র চলে গেছেন বলে জানা গেছে।
চিকিৎসকসংকটের কারণে বিশেষ করে প্রসূতি ও জটিল রোগীদের চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হচ্ছে। জরুরি প্রসবকালীন অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হলে রোগীদের অন্য হাসপাতালে পাঠাতে হচ্ছে। এতে সময় ও অর্থ—দুই দিক থেকেই ভোগান্তিতে পড়ছেন রোগী ও তাঁদের স্বজনেরা।
হাসপাতালে রোগীর উপস্থিতি কম
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) সরেজমিনে হাসপাতালে গিয়ে তুলনামূলক কম রোগীর উপস্থিতি দেখা গেছে। জরুরি বিভাগেও তেমন ভিড় ছিল না। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রয়োজনীয় চিকিৎসক, ওষুধ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুবিধা না থাকায় অনেকেই সরকারি হাসপাতালের পরিবর্তে বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের দিকে ঝুঁকছেন।
হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা কয়েকজন রোগী ও তাঁদের স্বজনের দাবি, চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্রে দেওয়া অধিকাংশ ওষুধ হাসপাতাল থেকে পাওয়া যায় না। তাঁদের অভিযোগ, প্রায় ৯০ শতাংশ ওষুধ বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে। ফলে ১০ থেকে ১২ কিলোমিটার দূর থেকে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের অতিরিক্ত সময় ও অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।
শীতের প্রভাবে জ্বর ও ঠান্ডাজনিত রোগীর সংখ্যা বাড়লেও পর্যাপ্ত চিকিৎসক না থাকায় সেবা পেতে সমস্যার মুখে পড়তে হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন কেউ কেউ। পাশাপাশি হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের খাবারের মান নিয়েও অসন্তোষ জানিয়েছেন রোগী ও তাঁদের স্বজনেরা।
সিজার করাতে গিয়ে বাড়তি ব্যয়ের চাপ
উপজেলার মিঠুর কান্দি এলাকা থেকে বোনকে নিয়ে হাসপাতালে এসেছিলেন হামিদুর রহমান। তিনি বলেন, “আমার বোনের সন্তান হবে। ব্যথা উঠলে আমরা তাকে হাসপাতালে নিয়ে আসি। এসে জানতে পারি, এখানে অপারেশনের কোনো ব্যবস্থা নেই। তারা আমাদের অন্য হাসপাতালে যেতে বলেন। পরে ছেংগারচরে একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে অপারেশন করাই।”
স্থানীয়দের ভাষ্য, গাইনি চিকিৎসক না থাকায় দীর্ঘদিন ধরে জরুরি সিজারিয়ান অস্ত্রোপচার বন্ধ থাকায় প্রসূতিদের চিকিৎসার জন্য বিকল্প প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। সরকারি হাসপাতালে স্বল্প খরচে চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ না থাকায় বিশেষ করে দরিদ্র ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারগুলো আর্থিক সংকটে পড়ছে।
এর আগে ছেংগারচরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের পর বিল পরিশোধ করতে না পেরে সন্তান বিক্রির অভিযোগ ওঠে। ঘটনাটি সে সময় সংবাদমাধ্যমে আলোচনার জন্ম দেয়। এমন পরিস্থিতিতে সরকারি হাসপাতালে জরুরি প্রসূতিসেবা চালু রাখার প্রয়োজনীয়তা আরও গুরুত্ব পাচ্ছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
অচল পরীক্ষা-নিরীক্ষার যন্ত্রপাতি
শুধু অস্ত্রোপচার নয়, হাসপাতালের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সেবাও ব্যাহত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, কয়েক মাস ধরে প্যাথলজি বিভাগের কার্যক্রম কার্যত বন্ধ রয়েছে। আলট্রাসনোগ্রাফি মেশিন নষ্ট হয়ে পড়ে আছে। কয়েক বছর ধরে বন্ধ রয়েছে এক্স-রে সেবাও।
ফলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাতে রোগীদের বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে যেতে হচ্ছে। এতে সরকারি প্রতিষ্ঠানে কম খরচে চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়েছে। সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন দরিদ্র ও নিম্নআয়ের মানুষ।
স্থানীয়দের অভিযোগ, গাইনি চিকিৎসকের পদে নিয়োগ থাকলেও সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক বর্তমানে ঢাকার পিজি হাসপাতালে ডেপুটেশনে কর্মরত রয়েছেন। এ ছাড়া ওষুধের ঘাটতি এবং চিকিৎসকদের সময়মতো কর্মস্থলে উপস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তাঁরা।
তদারকি বাড়ানোর দাবি
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, হাসপাতালের চিকিৎসক ও প্রয়োজনীয় জনবলসংকট দ্রুত সমাধানের পাশাপাশি ওষুধ সরবরাহ এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষার যন্ত্রপাতি সচল করার উদ্যোগ নিতে হবে। চিকিৎসকদের নির্ধারিত সময়ে উপস্থিতি ও দায়িত্ব পালনের বিষয়েও নিয়মিত তদারকি প্রয়োজন। কোনো অনিয়ম পাওয়া গেলে তদন্তের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
তাঁদের আশঙ্কা, দীর্ঘদিন ধরে এসব সমস্যার সমাধান না হলে হাসপাতালটির ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা আরও কমবে। এতে উপজেলার বিপুলসংখ্যক মানুষ সরকারি স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বেন।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
মতলব উত্তর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. রাজন চন্দ্র দাস বলেন, গাইনি চিকিৎসক না থাকায় জরুরি সিজারিয়ান অস্ত্রোপচার বন্ধ রয়েছে। চিকিৎসকসংকটের বিষয়টি জানিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে একাধিকবার লিখিতভাবে আবেদন করা হয়েছে। সমস্যা সমাধানে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস পাওয়া গেলেও এখন পর্যন্ত কার্যকর সমাধান হয়নি।
তিনি বলেন, “আমাদের চিকিৎসাসেবা ভালোই চলছে। তবে একাধিক পদ শূন্য থাকায় আগের মতো সেবা দিতে পারছি না।” জনবলসংকটের মধ্যেও সামর্থ্যের সর্বোচ্চটুকু দিয়ে চিকিৎসাসেবা চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন বলে জানান তিনি।
চিকিৎসকদের সময়মতো উপস্থিতি ও দায়িত্ব পালনে অবহেলার অভিযোগ প্রসঙ্গে ডা. রাজন চন্দ্র দাস বলেন, নির্ধারিত সময়ে দায়িত্ব পালনের বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। কোনো চিকিৎসক সময়মতো হাসপাতালে উপস্থিত না থাকলে বা দায়িত্বে অবহেলা করলে বিষয়টি তদন্ত ও যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
হাসপাতালের ওষুধ, অন্যান্য সেবার ঘাটতি ও জনবলসংকটের বিষয়েও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে বলে জানান তিনি।
এখন প্রশ্ন, পাঁচ লক্ষাধিক মানুষের স্বাস্থ্যসেবার গুরুত্বপূর্ণ এই প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসকসংকট, অচল যন্ত্রপাতি ও জরুরি প্রসূতিসেবার ঘাটতি দূর করে কবে স্বাভাবিক চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা হবে? স্থানীয়দের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নিয়ে হাসপাতালটির সেবার মান উন্নত করবে।