চাঁদপুরের হাজীগঞ্জে অভিমানী এক গৃহবধূ তার আব্দুর রহমান নামের ষোল মাস বয়সি শিশু সন্তানকে নিয়ে ট্রেনের নিচে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন। বুধবার (২৪ এপ্রিল) বিকাল সাড়ে ৩টার দিকে চাঁদপুর-লাকমাস রেলসড়কের হাজীগঞ্জ পৌরসভাধীন ৬নং ওয়ার্ড মকিমাবাদ এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।
আত্মহননকারী গৃহবধূ তাহমিনা আক্তার রিমা (২৪) উপজেলার হাটিলা পশ্চিম ইউনিয়নের ধড্ডা গ্রামের দেওয়ানজী বাড়ীর রফিকুল ইসলামের মেয়ে ও বাকিলা ইউনিয়নের সন্না গ্রামের কুয়েত প্রবাসী মো. মাসুদুজ্জামান হাওলাদারের স্ত্রী। তার সাড়ে ৪ বছর বয়সি আরও এক কন্যা সন্তান রয়েছে।
জানা গেছে, পারিবারিক কলহের জেরে গত ২৮ মার্চ রিমা তার স্বামী বাকিলা ইউনিয়নের স্বর্ণা গ্রামের হাওলাদার বাড়ীর নুরুল ইসলাম হাওলাদারের ছেলে মাসুদুজ্জামান হাওলাদার (৪০), তার ভাসুর মামুন হাওলাদার (৫৫)ও মাহবুব হাওলাদার (৫০) বিরুদ্ধে হাজীগঞ্জ থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন।
অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, রিমার বাবা তার স্বামী মাসুদুজ্জামানকে ৫ লাখ টাকা দিয়ে কুয়েত পাঠায়। বিদেশ যাওয়ার পর থেকে মাসুদ রিমাকে ভরণপোষণ ও তাদের (স্বামী) বাড়িতে না দিয়ে মোবাইল ফোনে অশ্লিল ভাষায় গালমন্দ করেন এবং হুমকি-ধমকি দিতে থাকেন। এক পর্যায়ে রিমা বাধ্য হয়ে মাসুদজ্জামানকে তালাক দেয়।
তালাকের পর স্বামী মাসুদুজ্জামান দেশে এসে ইমোতে অশ্লীল ভাষায় গালমন্দ ও প্রাণনাশ এবং স্বামী-স্ত্রীর বিভিন্ন ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছেড়ে দেয়ার হুমমি-ধমকি দেন। এ ঘটনায় ভাসুরদের জানালেও তারা কোন ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো রিমাকে হুমকি-ধমকি দেন বলে রিমার পরিবারের সদস্যরা জানান।
এক পর্যায়ে অপমান-অপদস্থ ও হুমকি-ধমকি সহ্য করতে না পেরে তার ষোল মাস বয়সি শিশু সন্তান আবদুর রহমানকে নিয়ে রিমা আত্মহত্যার পথ বেঁচে নেয়। তবে রিমা আত্মহত্যার পূর্বে তার ব্যবহৃত (সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম) ফেইসবুকে “আত্মহত্যার জন্য কেউ দায়ী নয়, তার মেয়েকে সবাই যেনো দেখে রাখে” উল্লেখ করে একটি পোস্ট দিয়েই ট্রেনের নিচে ঝাঁপিয়ে পড়ে। বিষয়টি হাজীগঞ্জে টক অব দ্যা টাউনে পরিণত হয়েছে।
এ ব্যাপারে রিমার পরিবারের সদস্য ও স্থানীয়দের ধারণা, থানায় দায়েরকৃত অভিযোগের কোন সুরাহা না হওয়ায় এবং পুলিশ কোন ব্যবস্থা না নেওয়া রিমা তার শিশু সন্তানকে নিয়ে আত্মহত্যা করেন।
অভিযোগের তদন্তকারী কর্মকর্তা ও হাজীগঞ্জ থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) আবদুর রহমান সংবাদকর্মীদের বলেন, অভিযোগ পাওয়ার পর বিষয়টি সুরাহার জন্য স্থানীয় ইউপি সদস্যসহ (বাকিলা ইউনিয়নের ইউপি সদস্য শাহাজাহন) অভিযুক্ত মাসুদুজ্জামান পরিবারের সাথে বসার চেষ্টার করা হয়। কিন্তু তারা রাজি হননি।
তিনি বলেন, এক সপ্তাহ পূর্বে মাসুদ্দুজামান দেশে আসেন। কিন্তু সে বাড়ীতে না এসে বিভিন্ন স্থানে পালিয়ে থাকার কারণে বিষয়টি সুরাহা করা সম্ভব হয়নি। এর মধ্যে জানতে পারি সে আবার প্রবাসে চলে গেছেন।
এ বিষয়ে মাসুদুজ্জামানের ওয়ার্ড বাকিলা ইউনিয়নের ৭নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য শাহজানের সাথে কথা হলে তিনি বলেন, এসআই আব্দুর রহমান বিষয়টি আমাকে জানানোর পর আমি তার (মাসুদ) সাথে কথা বলেছি। কিন্তু একবার কথা বলার পর সে আমার মোবাইল নম্বরটি ব্লক করে দেয়। যার কারণে আমি তার সাথে কথা বলতে পারিনি।
তিনি আরও বলেন, মাসুদের (মাসুদুজ্জামান) বাড়িতে যাওয়ার পর তার বড় ভাইদের বাড়িতে না পাওয়ায় মোবাইল নম্বর চেয়েছি, কিন্তু তাদের স্ত্রীরা মোবাইল নম্বর দেয়নি। যার কারণে তাদের সাথেও কথা বলতে পারিনি।
হাজীগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মুহাম্মদ আবদুর রশিদ বলেন, আত্মহত্যার ঘটনাটি যেহেতু রেল লাইনে ঘটেছে, তাই এ বিষয়ে জিআরপি পুুলিশ এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেবে। অন্য এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমি এসআই আবদুর রহমানের সাথে কথা বলেছি। সে বলেছে বিবাদীদের বাড়ীতে গিয়েছে।
চাঁদপুর রেলওয়ে (জিআরপি) থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মাসুদুর রহমান বলেন, সংবাদ পেয়ে ঘটনাস্থলে এসে লাশ দুইটির সুরতহাল প্রতিবেদন করা হয়েছে এবং ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ চাঁদপুর সরকারি জেনারেল হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। ঘটনাটি তদন্ত সাপেক্ষে আইনী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে
এ দিকে খবর পেয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও)ে তাপস শীল। এসময় তাঁর সাথে ছিলেন, উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) প্রকৌ. মো. জাকির হোসেন, উপজেলা যুবলীগের যুগ্ম আহবায়ক জাকির হোসেন সোহেল।




















