ঢাকা ১২:০২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বিএনপির জন্য রাজপথে, গুলি খেলেন শফিক—আজ দলের কেউ খবরও নেয় না!

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে সারাদেশজুড়ে যখন রাজনৈতিক উত্তেজনা চরমে, তখন বিএনপির ঘোষিত আন্দোলন কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছিলেন চাঁদপুরের হাজীগঞ্জের শফিকুল ইসলাম (৫৭)। শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে অংশ নিতে হাজীগঞ্জ পাইলট হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজের সামনে অবস্থান করছিলেন তিনি। হঠাৎ পুলিশের গুলিবর্ষণে পায়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে রাস্তায় লুটিয়ে পড়েন—সেই থেকেই শুরু তার জীবনের এক দীর্ঘ, বেদনাময় অধ্যায়।

শফিক গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর টানা ৯ মাস ধরে ঢাকা মেডিকেল কলেজসহ বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হয় তাকে। পায়ের অপারেশন, ওষুধ, থেরাপি—চিকিৎসা চালাতে গিয়ে নিজের বাবার শেষ সম্বল, এমনকি ঘরের গাছপালা ও তৈজসপত্র পর্যন্ত বিক্রি করে ফেলতে হয়। এখন তার যা আছে, তা শুধু একটি জরাজীর্ণ ঘরভিটা।

১১ বছর পেরিয়ে গেছে, পায়ের ক্ষত এখনো সারে না। মাঝে মাঝে তীব্র যন্ত্রণায় বিছানায় পড়ে থাকতে হয়। হাঁটা-চলা দুরূহ হয়ে পড়েছে। কোনো কাজ করতে পারেন না, ফলে পরিবার-পরিজন নিয়ে দিন পার করাটা হয়ে উঠেছে এক যুদ্ধ।

হাজীগঞ্জ পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের টোরাগড় এলাকার মুসলিম হাফেজ সাহেব বাড়ির এই বাসিন্দা এখন তিন সন্তানের বাবা—এক ছেলে ও দুই মেয়ে। তার মধ্যে একজন মেয়ে এখনো অবিবাহিত। সংসারের দৈন্যদশা চরমে। চিকিৎসার অভাবে পায়ের পুরনো ক্ষত দিন দিন জটিল আকার নিচ্ছে। সেইসাথে চোখের দৃষ্টিশক্তিও ক্রমশ কমে আসছে।

শফিক বলেন, “চিকিৎসা তো দূরের কথা, অনেক সময় ঘরে বাজার আনাও সম্ভব হয় না। দলের জন্য গুলি খেলাম, এখন কেউ একবার খোঁজও নেয় না।”

তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন—”আমি বিএনপির আন্দোলনের একজন নিবেদিত কর্মী ছিলাম। দলের ডাকে রাজপথে গিয়েছি। গুলি খেয়েছি। কিন্তু আজ বিএনপির কোনো নেতা, কোনো কর্মী—কেউ একবারও এসে খোঁজ নেয়নি। এক মুঠো সাহায্যও দেয়নি।”

শফিকুলের এই বক্তব্য বিএনপির মতো একটি স্থানীয় রাজনৈতিক দলের ভূমিকা নিয়েই প্রশ্ন তোলে। যাদের ডাকে আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন, জীবন বাজি রেখেছিলেন—দুঃসময়ে তারা কেউ পাশে দাঁড়ায়নি।

একটি গুলির আঘাতে থেমে যাওয়া শফিকুলের জীবন আজ কেবল বেঁচে থাকার সংগ্রাম। তিনি কোনো রাজকীয় সাহায্য চান না, শুধু চান একটি মানুষের মতো বাঁচার সুযোগ। তাঁর জন্য প্রয়োজন— পায়ের পূর্ণ চিকিৎসার ব্যবস্থা, চোখের চিকিৎসা ও ওষুধ, পরিবার চালানোর জন্য একটি স্থায়ী আয়ের সুযোগ, এবং অবিবাহিত মেয়ের বিয়ের জন্য কিছু সহায়তা।

শফিকুলের জীবনের এই করুণ চিত্র আমাদের সকলের বিবেককে নাড়া দেওয়ার মতো। এই প্রতিবেদন কেবল একটি গল্প নয়, এটি এক প্রতিবাদ—নেতা-কর্মী, দল ও সমাজের উদাসীনতার বিরুদ্ধে।

আজ যখন অনেকেই রাজনীতি করেন নিজের স্বার্থে, তখন শফিকের মতো মানুষরা স্মরণ করিয়ে দেন, রাজনীতি শুধু ক্ষমতার খেলা নয়—এটি মানুষের জন্য হওয়া উচিত।

বিএনপি দলীয়ভাবে এ বিষয়টি বিবেচনা করে এবং একজন গুলিবিদ্ধ কর্মীর পাশে দাঁড়াবে। পাশাপাশি সমাজের দানশীল ও সহৃদয় মানুষদের প্রতিও আহ্বান—আসুন, শফিকুলের পাশে দাঁড়াই। তাকে আবার বাঁচার সুযোগ করে দিই।

ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ

কচুয়ায় ফ্রি ভেটেরিনারি মেডিকেল ক্যাম্প অনুষ্ঠিত: বিনামূল্যে টিকা ও কৃমিনাশক প্রদান

বিএনপির জন্য রাজপথে, গুলি খেলেন শফিক—আজ দলের কেউ খবরও নেয় না!

আপডেট : ০৮:০২:২৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ১ জুন ২০২৫

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে সারাদেশজুড়ে যখন রাজনৈতিক উত্তেজনা চরমে, তখন বিএনপির ঘোষিত আন্দোলন কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছিলেন চাঁদপুরের হাজীগঞ্জের শফিকুল ইসলাম (৫৭)। শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে অংশ নিতে হাজীগঞ্জ পাইলট হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজের সামনে অবস্থান করছিলেন তিনি। হঠাৎ পুলিশের গুলিবর্ষণে পায়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে রাস্তায় লুটিয়ে পড়েন—সেই থেকেই শুরু তার জীবনের এক দীর্ঘ, বেদনাময় অধ্যায়।

শফিক গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর টানা ৯ মাস ধরে ঢাকা মেডিকেল কলেজসহ বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হয় তাকে। পায়ের অপারেশন, ওষুধ, থেরাপি—চিকিৎসা চালাতে গিয়ে নিজের বাবার শেষ সম্বল, এমনকি ঘরের গাছপালা ও তৈজসপত্র পর্যন্ত বিক্রি করে ফেলতে হয়। এখন তার যা আছে, তা শুধু একটি জরাজীর্ণ ঘরভিটা।

১১ বছর পেরিয়ে গেছে, পায়ের ক্ষত এখনো সারে না। মাঝে মাঝে তীব্র যন্ত্রণায় বিছানায় পড়ে থাকতে হয়। হাঁটা-চলা দুরূহ হয়ে পড়েছে। কোনো কাজ করতে পারেন না, ফলে পরিবার-পরিজন নিয়ে দিন পার করাটা হয়ে উঠেছে এক যুদ্ধ।

হাজীগঞ্জ পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের টোরাগড় এলাকার মুসলিম হাফেজ সাহেব বাড়ির এই বাসিন্দা এখন তিন সন্তানের বাবা—এক ছেলে ও দুই মেয়ে। তার মধ্যে একজন মেয়ে এখনো অবিবাহিত। সংসারের দৈন্যদশা চরমে। চিকিৎসার অভাবে পায়ের পুরনো ক্ষত দিন দিন জটিল আকার নিচ্ছে। সেইসাথে চোখের দৃষ্টিশক্তিও ক্রমশ কমে আসছে।

শফিক বলেন, “চিকিৎসা তো দূরের কথা, অনেক সময় ঘরে বাজার আনাও সম্ভব হয় না। দলের জন্য গুলি খেলাম, এখন কেউ একবার খোঁজও নেয় না।”

তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন—”আমি বিএনপির আন্দোলনের একজন নিবেদিত কর্মী ছিলাম। দলের ডাকে রাজপথে গিয়েছি। গুলি খেয়েছি। কিন্তু আজ বিএনপির কোনো নেতা, কোনো কর্মী—কেউ একবারও এসে খোঁজ নেয়নি। এক মুঠো সাহায্যও দেয়নি।”

শফিকুলের এই বক্তব্য বিএনপির মতো একটি স্থানীয় রাজনৈতিক দলের ভূমিকা নিয়েই প্রশ্ন তোলে। যাদের ডাকে আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন, জীবন বাজি রেখেছিলেন—দুঃসময়ে তারা কেউ পাশে দাঁড়ায়নি।

একটি গুলির আঘাতে থেমে যাওয়া শফিকুলের জীবন আজ কেবল বেঁচে থাকার সংগ্রাম। তিনি কোনো রাজকীয় সাহায্য চান না, শুধু চান একটি মানুষের মতো বাঁচার সুযোগ। তাঁর জন্য প্রয়োজন— পায়ের পূর্ণ চিকিৎসার ব্যবস্থা, চোখের চিকিৎসা ও ওষুধ, পরিবার চালানোর জন্য একটি স্থায়ী আয়ের সুযোগ, এবং অবিবাহিত মেয়ের বিয়ের জন্য কিছু সহায়তা।

শফিকুলের জীবনের এই করুণ চিত্র আমাদের সকলের বিবেককে নাড়া দেওয়ার মতো। এই প্রতিবেদন কেবল একটি গল্প নয়, এটি এক প্রতিবাদ—নেতা-কর্মী, দল ও সমাজের উদাসীনতার বিরুদ্ধে।

আজ যখন অনেকেই রাজনীতি করেন নিজের স্বার্থে, তখন শফিকের মতো মানুষরা স্মরণ করিয়ে দেন, রাজনীতি শুধু ক্ষমতার খেলা নয়—এটি মানুষের জন্য হওয়া উচিত।

বিএনপি দলীয়ভাবে এ বিষয়টি বিবেচনা করে এবং একজন গুলিবিদ্ধ কর্মীর পাশে দাঁড়াবে। পাশাপাশি সমাজের দানশীল ও সহৃদয় মানুষদের প্রতিও আহ্বান—আসুন, শফিকুলের পাশে দাঁড়াই। তাকে আবার বাঁচার সুযোগ করে দিই।