ঢাকা ০৮:৫৯ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সুমন আহমেদ

ঘুষ দুর্নীতির আখড়া মতলব উত্তর সাব-রেজিস্ট্রি অফিস

  • ডেস্ক নিউজ
  • আপডেট : ০৭:২৮:০৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ১১ এপ্রিল ২০২৬
  • 105

ঘুষ দুর্নীতির আখড়ায় পরিনত হয়েছে মতলব উত্তরে সাব-রেজিস্ট্রি অফিস, যেখানে দিনের পর দিন অনিয়ম আর দুর্নীতি বেড়েই চলছে। দলিল রেজিষ্ট্রেশন আইন সম্পর্কে জনসাধারণের অজ্ঞতার সুযোগে দলিল নিবন্ধনে ঘুষ বাবদ হাজার টাকা হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে ভূমির দলিল মূল্য অনুযায়ী প্রতি লাখে দুই থেকে তিন হাজার টাকা ঘুস দিতে হয় মতলব উত্তর সাবরেজিস্ট্রি অফিসে। সাব রেজিস্ট্রার মাহবুবের রহমান ওয়াজেদ ,অফিস সহকারী নাসিমা বেগম এবং স্থানীয় দলিল লেখক মিলে ঘুস বাণিজ্যের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট করে দলিল গ্রহীতার কাছ থেকে এভাবে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন। জমি রেজিস্ট্রি শেষ হলে লাখ হিসাবে ঘুসের টাকা প্রধান সহকারী নাসিমা বেগমের হাতে দিয়ে আসতে হয় দলিল লেখকদের। নিয়ম না থাকলেও এ অতিরিক্ত অর্থ আদায় করতে হচ্ছে তাদের, অন্যথায় আটকে দেওয়া হয় দলিল সম্পাদনার কাজ।

জানা গেছে, দলিল সম্পাদনা করতে সরকারি একটি নিয়ম রয়েছে। নিয়ম কী সেটিও মতলব উত্তরের  মানুষ জানেন না। কারণ মতলব উত্তরের সাবরেজিস্ট্রি অফিসে নিজস্ব নিয়ম করে দিয়েছেন, যা সরকারি নিয়মের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। সরকারি নিয়মে একটি দলিল সম্পাদনা করতে রেজিস্ট্রেশন ফি দলিল এর লিখিত মুল্যের ১% টাকা, স্ট্যাম্প শুল্ক দলিলে লিখিত মোট মূল্যের ১.৫% টাকা। স্থানীয় সরকার কর ৩%, উৎস কর ইউনিয়নে ২%, পৌরসভায় ৪%, টাকা।

সেই হিসেবে প্রতি লাখে পৌরসভায় ৯৫০০ টাকা
আর ইউনিয়নে ৭৫০০ টাকার পে-অর্ডার জমা দিতে হয়। কিন্তু দলিল লেখকরা মতলব উত্তর সাবরেজিস্ট্রি অফিসের ঘুসের টাকাসহ দলিল গ্রহীতাদের কাছ থেকে প্রতি লাখে ১০ হাজার টাকা থেকে ১৩ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করেন।

নিশ্চিন্তপুর গ্রামের মো: নজরুল ইসলাম জানান,সে নিশ্চিন্তপুর মৌজায় ২৯ শতাংশ জমি ক্রয় করেন যার দলিল মূল্য ১৩ লক্ষ ৫৬ হাজার টাকা। সে দলিল লিখকের  কাছে ১লক্ষ ১৩ হাজার ৫০০ টাকায় রেজিস্ট্রি সম্পন্ন করেছেন। কিন্তু সরকারি হিসেবে দলিল করতে খরচ হওয়ায় কথা ১ লক্ষ্য ১ হাজার ৭০০টাকা।

নবুরকান্দি গ্রামের মো: শাহজাহান জানান নবুরকান্দি মৌজায় ২ শতাংশ জমি ক্রয় করেন যার দলিল মূল্য ৭০ হাজার টাকা। সে দলিল লিখকের কাছে ১২ হাজার টাকায় রেজিস্ট্রি সম্পন্ন করেছেন। কিন্তু সরকারি হিসেবে দলিল করতে খরচ হওয়ায় কথা ৫ হাজার ২৫০ টাকা।

এদিকে প্রতিবেদকের পরিচয় গোপন রেখে দলিল লিখক শহিদুল ইসলামের সাথে কথা হলে, তিনি জানান ইসলামাবাদ মৌজায় ২০ শতাংশ জমি সাব কাওলা করতে দিতে হবে ৬৩ হাজার টাকা যার দলিল মুল্য  থাকবে ৬ লক্ষ্য ৯৫ হাজার টাকা। তাকে যখন বলা হয় সরকারী নিয়মনুসারে লাখে ৭.৫ শতাংশ টাকার হিসেবে ৫২ হাজার ৫২৫ টাকা আসে আপনি বেশি চাচ্ছেন কেন, তখন তিনি বলেন আপনার কথা ঠিক আছে কিন্তু সাব রেজিস্টার কে প্রতি লাখে ৫০০ টাকা করে দিতে হয় এবং কিছু অফিস খরচ দিতে হয়। তাই ৬৩ হাজার টাকার কমে তিনি পারবেন না।

ভুক্তভোগী মোহনপুর গ্রামের মো. ইব্রাহিম ও এনামুল হক জানান, দলিল প্রতি ২০০ থেকে ৩০০ টাকা করে নেন অফিস সহায়ক মো. ইব্রাহিম তাকে টাকা না দিলে দলিল এদিক সেদিক করে দেওয়ার হুমকি প্রদান করেন। তাছাড়া দলিলের নকল উঠাতেও দিতে হয় ২০০০ টাকা করে।

এ বিষয়ে অফিস সহকারী নাসিমা বেগম বলেন, দলিল লেখকরা সরকারি খরচের বাইরে যে অতিরিক্ত টাকা নেন, তা তারাই নিয়ন্ত্রণ করেন। ওই টাকার একটি অংশ তাদের সমিতিতে জমা হয় এবং কিছু অংশ অফিসের আনুষঙ্গিক খরচে ব্যয় হয়। দলিলের নকল তোলার ক্ষেত্রেও নির্ধারিত ফি-র বাইরে অতিরিক্ত যে লেনদেন হয়, তা মূলত সরবরাহকারীরাই নিয়ে থাকেন। এর বাইরে আমার আর কিছু জানা নেই।

সাব রেজিস্ট্রার মাহবুবের রহমান ওয়াজেদ বলেন, ইব্রাহিমের বিরুদ্ধে ২০০-৩০০ টাকা করে নেওয়ার বিষয়টি অনেক পুরনো। তবে ভবিষ্যতে সে যাতে এমন কাজ আর না করে, আমি নিজে তদারকি করব।
​অন্যান্য অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, “বাকি বিষয়গুলো সম্পর্কে আমি অবগত নই। তবে বিষয়গুলো অবশ্যই খতিয়ে দেখা হবে।

ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ

কচুয়ায় ফ্রি ভেটেরিনারি মেডিকেল ক্যাম্প অনুষ্ঠিত: বিনামূল্যে টিকা ও কৃমিনাশক প্রদান

সুমন আহমেদ

ঘুষ দুর্নীতির আখড়া মতলব উত্তর সাব-রেজিস্ট্রি অফিস

আপডেট : ০৭:২৮:০৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ১১ এপ্রিল ২০২৬

ঘুষ দুর্নীতির আখড়ায় পরিনত হয়েছে মতলব উত্তরে সাব-রেজিস্ট্রি অফিস, যেখানে দিনের পর দিন অনিয়ম আর দুর্নীতি বেড়েই চলছে। দলিল রেজিষ্ট্রেশন আইন সম্পর্কে জনসাধারণের অজ্ঞতার সুযোগে দলিল নিবন্ধনে ঘুষ বাবদ হাজার টাকা হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে ভূমির দলিল মূল্য অনুযায়ী প্রতি লাখে দুই থেকে তিন হাজার টাকা ঘুস দিতে হয় মতলব উত্তর সাবরেজিস্ট্রি অফিসে। সাব রেজিস্ট্রার মাহবুবের রহমান ওয়াজেদ ,অফিস সহকারী নাসিমা বেগম এবং স্থানীয় দলিল লেখক মিলে ঘুস বাণিজ্যের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট করে দলিল গ্রহীতার কাছ থেকে এভাবে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন। জমি রেজিস্ট্রি শেষ হলে লাখ হিসাবে ঘুসের টাকা প্রধান সহকারী নাসিমা বেগমের হাতে দিয়ে আসতে হয় দলিল লেখকদের। নিয়ম না থাকলেও এ অতিরিক্ত অর্থ আদায় করতে হচ্ছে তাদের, অন্যথায় আটকে দেওয়া হয় দলিল সম্পাদনার কাজ।

জানা গেছে, দলিল সম্পাদনা করতে সরকারি একটি নিয়ম রয়েছে। নিয়ম কী সেটিও মতলব উত্তরের  মানুষ জানেন না। কারণ মতলব উত্তরের সাবরেজিস্ট্রি অফিসে নিজস্ব নিয়ম করে দিয়েছেন, যা সরকারি নিয়মের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। সরকারি নিয়মে একটি দলিল সম্পাদনা করতে রেজিস্ট্রেশন ফি দলিল এর লিখিত মুল্যের ১% টাকা, স্ট্যাম্প শুল্ক দলিলে লিখিত মোট মূল্যের ১.৫% টাকা। স্থানীয় সরকার কর ৩%, উৎস কর ইউনিয়নে ২%, পৌরসভায় ৪%, টাকা।

সেই হিসেবে প্রতি লাখে পৌরসভায় ৯৫০০ টাকা
আর ইউনিয়নে ৭৫০০ টাকার পে-অর্ডার জমা দিতে হয়। কিন্তু দলিল লেখকরা মতলব উত্তর সাবরেজিস্ট্রি অফিসের ঘুসের টাকাসহ দলিল গ্রহীতাদের কাছ থেকে প্রতি লাখে ১০ হাজার টাকা থেকে ১৩ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করেন।

নিশ্চিন্তপুর গ্রামের মো: নজরুল ইসলাম জানান,সে নিশ্চিন্তপুর মৌজায় ২৯ শতাংশ জমি ক্রয় করেন যার দলিল মূল্য ১৩ লক্ষ ৫৬ হাজার টাকা। সে দলিল লিখকের  কাছে ১লক্ষ ১৩ হাজার ৫০০ টাকায় রেজিস্ট্রি সম্পন্ন করেছেন। কিন্তু সরকারি হিসেবে দলিল করতে খরচ হওয়ায় কথা ১ লক্ষ্য ১ হাজার ৭০০টাকা।

নবুরকান্দি গ্রামের মো: শাহজাহান জানান নবুরকান্দি মৌজায় ২ শতাংশ জমি ক্রয় করেন যার দলিল মূল্য ৭০ হাজার টাকা। সে দলিল লিখকের কাছে ১২ হাজার টাকায় রেজিস্ট্রি সম্পন্ন করেছেন। কিন্তু সরকারি হিসেবে দলিল করতে খরচ হওয়ায় কথা ৫ হাজার ২৫০ টাকা।

এদিকে প্রতিবেদকের পরিচয় গোপন রেখে দলিল লিখক শহিদুল ইসলামের সাথে কথা হলে, তিনি জানান ইসলামাবাদ মৌজায় ২০ শতাংশ জমি সাব কাওলা করতে দিতে হবে ৬৩ হাজার টাকা যার দলিল মুল্য  থাকবে ৬ লক্ষ্য ৯৫ হাজার টাকা। তাকে যখন বলা হয় সরকারী নিয়মনুসারে লাখে ৭.৫ শতাংশ টাকার হিসেবে ৫২ হাজার ৫২৫ টাকা আসে আপনি বেশি চাচ্ছেন কেন, তখন তিনি বলেন আপনার কথা ঠিক আছে কিন্তু সাব রেজিস্টার কে প্রতি লাখে ৫০০ টাকা করে দিতে হয় এবং কিছু অফিস খরচ দিতে হয়। তাই ৬৩ হাজার টাকার কমে তিনি পারবেন না।

ভুক্তভোগী মোহনপুর গ্রামের মো. ইব্রাহিম ও এনামুল হক জানান, দলিল প্রতি ২০০ থেকে ৩০০ টাকা করে নেন অফিস সহায়ক মো. ইব্রাহিম তাকে টাকা না দিলে দলিল এদিক সেদিক করে দেওয়ার হুমকি প্রদান করেন। তাছাড়া দলিলের নকল উঠাতেও দিতে হয় ২০০০ টাকা করে।

এ বিষয়ে অফিস সহকারী নাসিমা বেগম বলেন, দলিল লেখকরা সরকারি খরচের বাইরে যে অতিরিক্ত টাকা নেন, তা তারাই নিয়ন্ত্রণ করেন। ওই টাকার একটি অংশ তাদের সমিতিতে জমা হয় এবং কিছু অংশ অফিসের আনুষঙ্গিক খরচে ব্যয় হয়। দলিলের নকল তোলার ক্ষেত্রেও নির্ধারিত ফি-র বাইরে অতিরিক্ত যে লেনদেন হয়, তা মূলত সরবরাহকারীরাই নিয়ে থাকেন। এর বাইরে আমার আর কিছু জানা নেই।

সাব রেজিস্ট্রার মাহবুবের রহমান ওয়াজেদ বলেন, ইব্রাহিমের বিরুদ্ধে ২০০-৩০০ টাকা করে নেওয়ার বিষয়টি অনেক পুরনো। তবে ভবিষ্যতে সে যাতে এমন কাজ আর না করে, আমি নিজে তদারকি করব।
​অন্যান্য অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, “বাকি বিষয়গুলো সম্পর্কে আমি অবগত নই। তবে বিষয়গুলো অবশ্যই খতিয়ে দেখা হবে।