ঢাকা ০৬:৪৯ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

হাজীগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী ফুলছোঁয়া গ্রামের কৃতি সন্তান মাওলানা মুফতি আবু সাঈদ এর জীবনী

 

চাঁদপুর জেলার হাজীগঞ্জ উপজেলা ২নং বাকিলা ইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহী ফুলছোঁয়া গ্রামের কৃতি সন্তান মাওলানা মুফতি আবু সাঈদ। আমরা চাঁদপুর জেলাবাসী সহ বাংলাদেশবাসী ধন্য হাজীগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী ফুলছোঁয়া গ্রামের কৃতি সন্তান মাওলানা মুফতি আবু সাঈদ মহরতীর জন্য।

 

তিনি ঢাকা ফরিদাবাদ মাদ্রাসার প্রধান মুফতি, প্রাজ্ঞ আলোচক ও নন্দিত লেখক ঢাকার ঐতিহ্যবাহী দ্বীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জামিয়া আরাবিয়া ইমদাদুল উলূম ফরিদাবাদ মাদ্রাসার প্রধান মুফতি এবং বিশিষ্ট শায়খুল হাদিস মাওলানা মুফতি আবু সাঈদ।

 

বিশিষ্ট শায়খুল হাদিস মাওলানা মুফতি আবু সাঈদ  দীর্ঘদিন ধরে ফরিদাবাদ মাদ্রাসায় অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে হাদিস, ফিকহ ও ফাতোয়ার পাঠদান করে আসছেন এবং দেশব্যাপী একজন প্রাজ্ঞ কওমি আলেম ও লেখক হিসেবে বিশেষভাবে সমাদৃত।

 

মাওলানা মুফতি আবু সাঈদ ১৯৬২ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি চাঁদপুর জেলার হাজীগঞ্জ থানাধীন ফুলছোঁয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মৌলভী আব্দুল লতিফ (রহ.) একজন বুজুর্গ মানুষ এবং শিক্ষক ছিলেন।

 

মুফতি আবু সাঈদ প্রথমে গ্রামের সাবাহি মক্তব ও প্রাইমারি স্কুলে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেন। অতঃপর নানাবাড়ি উজানীতে অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী দীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হন। সেখানে সানাবিয়া মারহালা (উচ্চ মাধ্যমিক স্তর) প্রথম বর্ষ (কাফিয়া) পর্যন্ত অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে লেখাপড়া করেন।

 

পরে রাজধানী ঢাকার ঐতিহ্যবাহী দীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জামিয়া আরাবিয়া ইমদাদুল উলুম ফরিদাবাদে ভর্তি হন। সেখানে সানাবিয়া উলইয়া স্তর থেকে সর্বোচ্চ শ্রেণি দাওরায়ে হাদিস (তাকমিল) শ্রেণি পর্যন্ত কৃতিত্বের সঙ্গে লেখাপড়া করেন। শিক্ষা জীবনের শুরু থেকে শেষ অবধি প্রায় সব শ্রেণিতে রেকর্ড সংখ্যক নম্বর পাওয়ার গৌরব অর্জন করেন।

 

১৪০৪-০৫ হিজরি মোতাবেক ১৯৮৪-৮৫ খ্রিস্টাব্দে তিনি বিশ্ববিখ্যাত ইসলামি বিদ্যাপীঠ দারুল উলুম দেওবন্দ গমন করেন। সেখানে পুনরায় দাওরায় হাদিসে ভর্তি হন এবং মুফতি সাঈদ আহমদ পালনপুরী (রহ.)-এর কাছে সহিহ বোখারি প্রথম ভাগ ও সুনানে তিরমিজি প্রথম ভাগ পড়ার সৌভাগ্য অর্জন করেন। মুফতি আবু সাঈদ হজরত মুফতি সাঈদ আহমাদ পালনপুরী (রহ.)-এর চিন্তা-দর্শন ও জীবনাদর্শ দ্বারা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত।

 

দারুল উলুম দেওবন্দের বার্ষিক পরীক্ষায় তিনি প্রথম স্থান অর্জন করে প্রগাঢ় ধীশক্তি ও তীক্ষ্ম মেধার স্বাক্ষর রাখেন। দাওরায়ে হাদিস পাসের পর রমজান মাসে তিনি দেওবন্দের প্রধান মুফতি হজরত হাবিবুর রহমান খায়রাবাদীর কাছে ফাতোয়া ও ফারায়েজের ওপর বিশেষ প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। হজরত খায়রাবাদী তার অসাধারণ প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে বিশেষ সনদ দেন এবং দেশে ফিরে ফাতোয়া ও ফারায়েজের কাজ করার অনুমতি প্রদান করেন।

 

দেওবন্দে থাকাকালেই ফরিদাবাদ মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ তাকে উচ্চস্তরের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেন। শিক্ষকতার সূচনালগ্নেই তিনি ফরিদাবাদ মাদ্রাসার প্রধান মুফতির পদ অলংকৃত করেন। সেখানে প্রধান মুফতি বা মুফতি-এ-আজম হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এবং ফিকহ ও ফাতোয়ার জগতে জাতীয় পর্যায়ে অগ্রগণ্য আলেমদের একজন।

 

নিরবচ্ছিন্ন অধ্যয়ন, নিরন্তর অধ্যবসায় ও নিরলস প্রচেষ্টার মাধ্যমে তিনি হাদিস, তাফসির, ফিকহ, মানতিক ইত্যাদি বিভিন্ন শাস্ত্রে অগাধ পাণ্ডিত্য অর্জন করেন। ধীরে ধীরে তিনি জাতীয় অঙ্গনে ফিকহ ও ফাতোয়ার জগতের উজ্জ্বল জ্যোতিষ্করূপে আবির্ভূত হন। প্রচুর অনুসন্ধিৎসু মন নিয়ে অধ্যয়ন করে পাঠদান করেন বিধায় মেধাবী-অমেধাবী সর্বশ্রেণির শিক্ষার্থী তার ক্লাস পছন্দ করেন। তার জ্ঞানরাজ্য থেকে কেউই বঞ্চিত হন না।

 

জন্মগতভাবেই তিনি অলি-আউলিয়ার বংশধর। তার ধমনিতে বরেণ্য পীর-মাশায়েখের শোনিতধারা প্রবাহিত। তাসাউফ-আধ্যাত্মিকতা তার পারিবারিক উত্তরাধিকার। ছোট-বড় সবাইকে আগে আগে সালাম দেওয়া অনন্য বৈশিষ্ট্য তার।

 

ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ তত্ত্বাবধানে অর্ধশতাধিক দীনি মাদ্রাসা পরিচালিত হচ্ছে। তার পীর ও মুর্শিদ হজরত নানুপুরী (রহ.) তাকে নিজ এলাকায় মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দেন। হজরতের নির্দেশক্রমে তিনি নিজ গ্রাম ফুলছোঁয়ায় পিতার দেওয়া ৩০ শতাংশ জায়গার ওপর ২০ শাওয়াল ১৪১৫ হিজরি মোতাবেক ২২ মার্চ ১৯৯৫ খ্রিস্টাব্দ বুধবার উজানীর পীর হজরত মাওলানা মোবারক করীম (রহ.) ও ফরিদাবাদ মাদ্রাসার সাবেক শায়খুল হাদিস আল্লামা আবদুল হাফীজ (রহ.)-সহ দেশবরেণ্য উলামা-মাশায়েখদের হাতে অনাড়ম্বর রুহানি পরিবেশে খালেস তাকওয়া, ইখলাস ও তাওয়াক্কুলের ওপর জামিয়া কুরআনিয়া ইমদাদুল উলুম ফুলছোঁয়া নামে মাদ্রাসার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।

 

মাত্র দুই যুগের ব্যবধানে বর্তমানে মাদ্রাসার জায়গা বিস্তৃত হয়েছে চার একরে। মাদ্রাসাটি ফিকহ ও ফতোয়া বিভাগ, আরবি আদব ও ভাষা শিক্ষা বিভাগ ইত্যাদি বিশেষায়িত বিভাগসহ কওমি মাদ্রাসার কারিকুলামের সর্বোচ্চ শ্রেণি দাওরায়ে হাদিস পর্যন্ত উন্নীত হয়েছে। জায়গার সুপ্রশস্ততা, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং শিক্ষার্থীদের আমল-আখলাকের উৎকর্ষতা অর্জনের মাধ্যমে মাদ্রাসাটি দেশের প্রথম সারির মাদ্রাসা ও অন্যতম প্রধান দীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিগণিত।

 

এই মাদ্রাসা ছাড়াও ইসলামি জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় গবেষণা ও সুদক্ষ লোক তৈরির লক্ষ্যে তিনি ঢাকার শ্যামপুরে (রসুলবাগ) সুবিস্তৃত জমিতে গড়ে তুলেছেন দারুল ফিকরি ওয়াল ইরশাদ। এছাড়া আরও অনেক প্রতিষ্ঠান পরিচালনা ও প্রতিষ্ঠার সঙ্গে তিনি জড়িত।

 

মুফতি আবু সাঈদ ওয়াজ-নসিহত, বক্তৃতা-বক্তব্যের মাধ্যমে মুসলমানদের নৈতিকতাসম্পন্ন খাঁটি দীনদার সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে সতত প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। পাশাপাশি একাধিক মাদ্রাসায় সহিহ বোখারি শরিফের দরস দিয়ে ছাত্রদের ইলমে নববির জ্ঞানপিপাসা নিবারণে নিমগ্ন রয়েছেন। প্রচলিত সব ধরনের রাজনীতির সংশ্রব থেকে তিনি নিজেকে গুটিয়ে রেখেছেন। তবে ইসলামবিরোধী অথবা দেশ ও জাতিবিরোধী যেকোনো ষড়যন্ত্র চক্রান্ত ও অপতৎপরতার বিরুদ্ধে তিনি ওয়াজ-নসিহত ও বক্তৃতা-বিবৃতির মাধ্যমে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় তীব্র প্রতিবাদ করে থাকেন।

 

প্রতি বছর ফুলছোঁয়া মাদ্রাসার বিস্তৃত ময়দানে মুফতি আবু সাঈদের তত্ত্বাবধানে দুই দিনব্যাপী মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ইশকে ইলাহির অদম্য উচ্ছ্বাসে তীব্র আকর্ষণে ফুলছোঁয়ার ফুলেল সৌরভে বিমোহিত হয়ে ছুটে আসেন ভক্ত-মুরিদানরা।

 

দীনি বিষয়ক তার অনেক নিবন্ধ-প্রবন্ধ ও বই প্রকাশিত হয়েছে।  তার রচিত ও সম্পাদিত বইয়ের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো- সমকালীন জরুরি মাসয়িল, আধুনিক সমস্যার সমাধান, মৌলিক আকিদা, পাঁচ ওয়াক্তের হাদিয়া, মহিলারা কোথায় নামাজ আদায় করবেন, ইসলামের দৃষ্টিতে রোগী ডাক্তার ও চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি। ইতিমধ্যে তার বয়ানের সংকলন ‘দীনি মাওয়ায়েজ’ নামে প্রকাশিত হয়েছে।

 

আমরা সকলে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের কাছে বিশিষ্ট শায়খুল হাদিস মাওলানা মুফতি আবু সাঈদ হুজুরের দীর্ঘ নেক হায়াত কামনা করছি। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন যেন আমাদের মাঝে উনাকে দীর্ঘ নেক হায়াত দান করে আরো বহু বছর বাঁচিয়ে রাখেন। এই আলোকিত মানুষটির জন্য চাঁদপুর জেলার হাজীগঞ্জ উপজেলা ২নং বাকিলা ইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহী ফুলছোঁয়া সহ গোটা চাঁদপুর জেলাবাসী ও দেশবাসী আজ আলোকিত।

ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ

ফরিদগঞ্জে দোকান ভাঙচুরের অভিযোগ, সম্পত্তি নিয়ে দুই পক্ষের বিরোধ

হাজীগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী ফুলছোঁয়া গ্রামের কৃতি সন্তান মাওলানা মুফতি আবু সাঈদ এর জীবনী

আপডেট : ০৬:৩৫:৫৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৯ জুলাই ২০২৬

 

চাঁদপুর জেলার হাজীগঞ্জ উপজেলা ২নং বাকিলা ইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহী ফুলছোঁয়া গ্রামের কৃতি সন্তান মাওলানা মুফতি আবু সাঈদ। আমরা চাঁদপুর জেলাবাসী সহ বাংলাদেশবাসী ধন্য হাজীগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী ফুলছোঁয়া গ্রামের কৃতি সন্তান মাওলানা মুফতি আবু সাঈদ মহরতীর জন্য।

 

তিনি ঢাকা ফরিদাবাদ মাদ্রাসার প্রধান মুফতি, প্রাজ্ঞ আলোচক ও নন্দিত লেখক ঢাকার ঐতিহ্যবাহী দ্বীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জামিয়া আরাবিয়া ইমদাদুল উলূম ফরিদাবাদ মাদ্রাসার প্রধান মুফতি এবং বিশিষ্ট শায়খুল হাদিস মাওলানা মুফতি আবু সাঈদ।

 

বিশিষ্ট শায়খুল হাদিস মাওলানা মুফতি আবু সাঈদ  দীর্ঘদিন ধরে ফরিদাবাদ মাদ্রাসায় অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে হাদিস, ফিকহ ও ফাতোয়ার পাঠদান করে আসছেন এবং দেশব্যাপী একজন প্রাজ্ঞ কওমি আলেম ও লেখক হিসেবে বিশেষভাবে সমাদৃত।

 

মাওলানা মুফতি আবু সাঈদ ১৯৬২ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি চাঁদপুর জেলার হাজীগঞ্জ থানাধীন ফুলছোঁয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মৌলভী আব্দুল লতিফ (রহ.) একজন বুজুর্গ মানুষ এবং শিক্ষক ছিলেন।

 

মুফতি আবু সাঈদ প্রথমে গ্রামের সাবাহি মক্তব ও প্রাইমারি স্কুলে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেন। অতঃপর নানাবাড়ি উজানীতে অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী দীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হন। সেখানে সানাবিয়া মারহালা (উচ্চ মাধ্যমিক স্তর) প্রথম বর্ষ (কাফিয়া) পর্যন্ত অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে লেখাপড়া করেন।

 

পরে রাজধানী ঢাকার ঐতিহ্যবাহী দীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জামিয়া আরাবিয়া ইমদাদুল উলুম ফরিদাবাদে ভর্তি হন। সেখানে সানাবিয়া উলইয়া স্তর থেকে সর্বোচ্চ শ্রেণি দাওরায়ে হাদিস (তাকমিল) শ্রেণি পর্যন্ত কৃতিত্বের সঙ্গে লেখাপড়া করেন। শিক্ষা জীবনের শুরু থেকে শেষ অবধি প্রায় সব শ্রেণিতে রেকর্ড সংখ্যক নম্বর পাওয়ার গৌরব অর্জন করেন।

 

১৪০৪-০৫ হিজরি মোতাবেক ১৯৮৪-৮৫ খ্রিস্টাব্দে তিনি বিশ্ববিখ্যাত ইসলামি বিদ্যাপীঠ দারুল উলুম দেওবন্দ গমন করেন। সেখানে পুনরায় দাওরায় হাদিসে ভর্তি হন এবং মুফতি সাঈদ আহমদ পালনপুরী (রহ.)-এর কাছে সহিহ বোখারি প্রথম ভাগ ও সুনানে তিরমিজি প্রথম ভাগ পড়ার সৌভাগ্য অর্জন করেন। মুফতি আবু সাঈদ হজরত মুফতি সাঈদ আহমাদ পালনপুরী (রহ.)-এর চিন্তা-দর্শন ও জীবনাদর্শ দ্বারা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত।

 

দারুল উলুম দেওবন্দের বার্ষিক পরীক্ষায় তিনি প্রথম স্থান অর্জন করে প্রগাঢ় ধীশক্তি ও তীক্ষ্ম মেধার স্বাক্ষর রাখেন। দাওরায়ে হাদিস পাসের পর রমজান মাসে তিনি দেওবন্দের প্রধান মুফতি হজরত হাবিবুর রহমান খায়রাবাদীর কাছে ফাতোয়া ও ফারায়েজের ওপর বিশেষ প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। হজরত খায়রাবাদী তার অসাধারণ প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে বিশেষ সনদ দেন এবং দেশে ফিরে ফাতোয়া ও ফারায়েজের কাজ করার অনুমতি প্রদান করেন।

 

দেওবন্দে থাকাকালেই ফরিদাবাদ মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ তাকে উচ্চস্তরের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেন। শিক্ষকতার সূচনালগ্নেই তিনি ফরিদাবাদ মাদ্রাসার প্রধান মুফতির পদ অলংকৃত করেন। সেখানে প্রধান মুফতি বা মুফতি-এ-আজম হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এবং ফিকহ ও ফাতোয়ার জগতে জাতীয় পর্যায়ে অগ্রগণ্য আলেমদের একজন।

 

নিরবচ্ছিন্ন অধ্যয়ন, নিরন্তর অধ্যবসায় ও নিরলস প্রচেষ্টার মাধ্যমে তিনি হাদিস, তাফসির, ফিকহ, মানতিক ইত্যাদি বিভিন্ন শাস্ত্রে অগাধ পাণ্ডিত্য অর্জন করেন। ধীরে ধীরে তিনি জাতীয় অঙ্গনে ফিকহ ও ফাতোয়ার জগতের উজ্জ্বল জ্যোতিষ্করূপে আবির্ভূত হন। প্রচুর অনুসন্ধিৎসু মন নিয়ে অধ্যয়ন করে পাঠদান করেন বিধায় মেধাবী-অমেধাবী সর্বশ্রেণির শিক্ষার্থী তার ক্লাস পছন্দ করেন। তার জ্ঞানরাজ্য থেকে কেউই বঞ্চিত হন না।

 

জন্মগতভাবেই তিনি অলি-আউলিয়ার বংশধর। তার ধমনিতে বরেণ্য পীর-মাশায়েখের শোনিতধারা প্রবাহিত। তাসাউফ-আধ্যাত্মিকতা তার পারিবারিক উত্তরাধিকার। ছোট-বড় সবাইকে আগে আগে সালাম দেওয়া অনন্য বৈশিষ্ট্য তার।

 

ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ তত্ত্বাবধানে অর্ধশতাধিক দীনি মাদ্রাসা পরিচালিত হচ্ছে। তার পীর ও মুর্শিদ হজরত নানুপুরী (রহ.) তাকে নিজ এলাকায় মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দেন। হজরতের নির্দেশক্রমে তিনি নিজ গ্রাম ফুলছোঁয়ায় পিতার দেওয়া ৩০ শতাংশ জায়গার ওপর ২০ শাওয়াল ১৪১৫ হিজরি মোতাবেক ২২ মার্চ ১৯৯৫ খ্রিস্টাব্দ বুধবার উজানীর পীর হজরত মাওলানা মোবারক করীম (রহ.) ও ফরিদাবাদ মাদ্রাসার সাবেক শায়খুল হাদিস আল্লামা আবদুল হাফীজ (রহ.)-সহ দেশবরেণ্য উলামা-মাশায়েখদের হাতে অনাড়ম্বর রুহানি পরিবেশে খালেস তাকওয়া, ইখলাস ও তাওয়াক্কুলের ওপর জামিয়া কুরআনিয়া ইমদাদুল উলুম ফুলছোঁয়া নামে মাদ্রাসার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।

 

মাত্র দুই যুগের ব্যবধানে বর্তমানে মাদ্রাসার জায়গা বিস্তৃত হয়েছে চার একরে। মাদ্রাসাটি ফিকহ ও ফতোয়া বিভাগ, আরবি আদব ও ভাষা শিক্ষা বিভাগ ইত্যাদি বিশেষায়িত বিভাগসহ কওমি মাদ্রাসার কারিকুলামের সর্বোচ্চ শ্রেণি দাওরায়ে হাদিস পর্যন্ত উন্নীত হয়েছে। জায়গার সুপ্রশস্ততা, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং শিক্ষার্থীদের আমল-আখলাকের উৎকর্ষতা অর্জনের মাধ্যমে মাদ্রাসাটি দেশের প্রথম সারির মাদ্রাসা ও অন্যতম প্রধান দীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিগণিত।

 

এই মাদ্রাসা ছাড়াও ইসলামি জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় গবেষণা ও সুদক্ষ লোক তৈরির লক্ষ্যে তিনি ঢাকার শ্যামপুরে (রসুলবাগ) সুবিস্তৃত জমিতে গড়ে তুলেছেন দারুল ফিকরি ওয়াল ইরশাদ। এছাড়া আরও অনেক প্রতিষ্ঠান পরিচালনা ও প্রতিষ্ঠার সঙ্গে তিনি জড়িত।

 

মুফতি আবু সাঈদ ওয়াজ-নসিহত, বক্তৃতা-বক্তব্যের মাধ্যমে মুসলমানদের নৈতিকতাসম্পন্ন খাঁটি দীনদার সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে সতত প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। পাশাপাশি একাধিক মাদ্রাসায় সহিহ বোখারি শরিফের দরস দিয়ে ছাত্রদের ইলমে নববির জ্ঞানপিপাসা নিবারণে নিমগ্ন রয়েছেন। প্রচলিত সব ধরনের রাজনীতির সংশ্রব থেকে তিনি নিজেকে গুটিয়ে রেখেছেন। তবে ইসলামবিরোধী অথবা দেশ ও জাতিবিরোধী যেকোনো ষড়যন্ত্র চক্রান্ত ও অপতৎপরতার বিরুদ্ধে তিনি ওয়াজ-নসিহত ও বক্তৃতা-বিবৃতির মাধ্যমে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় তীব্র প্রতিবাদ করে থাকেন।

 

প্রতি বছর ফুলছোঁয়া মাদ্রাসার বিস্তৃত ময়দানে মুফতি আবু সাঈদের তত্ত্বাবধানে দুই দিনব্যাপী মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ইশকে ইলাহির অদম্য উচ্ছ্বাসে তীব্র আকর্ষণে ফুলছোঁয়ার ফুলেল সৌরভে বিমোহিত হয়ে ছুটে আসেন ভক্ত-মুরিদানরা।

 

দীনি বিষয়ক তার অনেক নিবন্ধ-প্রবন্ধ ও বই প্রকাশিত হয়েছে।  তার রচিত ও সম্পাদিত বইয়ের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো- সমকালীন জরুরি মাসয়িল, আধুনিক সমস্যার সমাধান, মৌলিক আকিদা, পাঁচ ওয়াক্তের হাদিয়া, মহিলারা কোথায় নামাজ আদায় করবেন, ইসলামের দৃষ্টিতে রোগী ডাক্তার ও চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি। ইতিমধ্যে তার বয়ানের সংকলন ‘দীনি মাওয়ায়েজ’ নামে প্রকাশিত হয়েছে।

 

আমরা সকলে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের কাছে বিশিষ্ট শায়খুল হাদিস মাওলানা মুফতি আবু সাঈদ হুজুরের দীর্ঘ নেক হায়াত কামনা করছি। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন যেন আমাদের মাঝে উনাকে দীর্ঘ নেক হায়াত দান করে আরো বহু বছর বাঁচিয়ে রাখেন। এই আলোকিত মানুষটির জন্য চাঁদপুর জেলার হাজীগঞ্জ উপজেলা ২নং বাকিলা ইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহী ফুলছোঁয়া সহ গোটা চাঁদপুর জেলাবাসী ও দেশবাসী আজ আলোকিত।