ঢাকা ০৩:৪৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ডেঙ্গু জ্বরে হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা কতটা কার্যকর? পরামর্শ দিলেন ডা. আহসান হাবিব পাটওয়ারী

  • ডেস্ক নিউজ
  • আপডেট : ০১:২০:৪৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬
  • 58

 

বাংলাদেশে ডেঙ্গু জ্বর ক্রমেই জনস্বাস্থ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে বর্ষা ও বর্ষা-পরবর্তী সময়ে এডিস মশার বিস্তার বেড়ে যাওয়ায় ডেঙ্গু সংক্রমণের ঝুঁকিও বৃদ্ধি পায়। তবে বর্তমানে ডেঙ্গু শুধু নির্দিষ্ট কোনো মৌসুমের রোগ হিসেবে সীমাবদ্ধ নেই। বছরের বিভিন্ন সময়েই এ রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ডেঙ্গু মূলত একটি ভাইরাসজনিত সংক্রামক রোগ, যা ডেঙ্গু ভাইরাসবাহী স্ত্রী এডিস মশার কামড়ের মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে। আক্রান্ত ব্যক্তির ক্ষেত্রে সাধারণ জ্বর থেকে শুরু করে মারাত্মক শারীরিক জটিলতাও দেখা দিতে পারে। তাই ডেঙ্গু সম্পর্কে সঠিক ধারণা, প্রাথমিক লক্ষণ শনাক্তকরণ এবং সময়মতো চিকিৎসা গ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ডেঙ্গু জ্বরের প্রাথমিক লক্ষণঃ

ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার সাধারণত ৪ থেকে ১০ দিনের মধ্যে উপসর্গ প্রকাশ পেতে পারে। রোগীর শরীরে হঠাৎ উচ্চমাত্রার জ্বর, প্রচণ্ড মাথাব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা, মাংসপেশি ও অস্থিসন্ধিতে ব্যথা, বমি বমি ভাব, ক্ষুধামন্দা এবং অতিরিক্ত দুর্বলতা দেখা দিতে পারে।
অনেক ক্ষেত্রে শরীরে লালচে ফুসকুড়িও দেখা যায়। তবে সব রোগীর ক্ষেত্রে একই ধরনের লক্ষণ প্রকাশ পায় না। কারও কারও সামান্য উপসর্গ থাকলেও পরবর্তী সময়ে জটিলতা তৈরি হতে পারে।

ডেঙ্গুতে হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসার ভূমিকাঃ

হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসাপদ্ধতিতে রোগীর ব্যক্তিগত লক্ষণ, শারীরিক অবস্থা এবং সামগ্রিক উপসর্গ বিবেচনা করে চিকিৎসা নির্বাচনের প্রচলন রয়েছে।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন—ডেঙ্গু ভাইরাস নির্মূল, রক্তের প্লাটিলেট বৃদ্ধি, রক্তক্ষরণ প্রতিরোধ কিংবা ডেঙ্গুর মারাত্মক জটিলতা নিরাময়ে কোনো হোমিওপ্যাথিক ওষুধের কার্যকারিতা নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক গবেষণায় প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
তাই ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর ক্ষেত্রে হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসাকে মূল চিকিৎসার বিকল্প হিসেবে গ্রহণ করা নিরাপদ নয়। কোনো রোগী সম্পূরক চিকিৎসা গ্রহণ করতে আগ্রহী হলে অবশ্যই সংশ্লিষ্ট চিকিৎসককে বিষয়টি জানাতে হবে। এতে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা, পর্যবেক্ষণ কিংবা হাসপাতালে ভর্তি হতে বিলম্ব করা যাবে না।
ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে রোগীর জীবনরক্ষা এবং জটিলতা প্রতিরোধই চিকিৎসার প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত।

রোগ নির্ণয়ে প্রয়োজনীয় পরীক্ষাঃ

ডেঙ্গুর উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত নিবন্ধিত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। রোগের সময়কাল ও শারীরিক অবস্থা বিবেচনায় চিকিৎসক প্রয়োজনীয় পরীক্ষা নির্ধারণ করবেন।
সাধারণত জ্বরের প্রথম পাঁচ দিনের মধ্যে NS1 Antigen পরীক্ষা কার্যকর হতে পারে। অন্যদিকে রোগের পরবর্তী পর্যায়ে IgM অ্যান্টিবডি পরীক্ষা প্রয়োজন হতে পারে।
পাশাপাশি CBC পরীক্ষার মাধ্যমে প্লাটিলেট, হেমাটোক্রিটসহ রক্তের বিভিন্ন উপাদানের পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করা হয়।
তবে মনে রাখতে হবে, শুধু প্লাটিলেটের সংখ্যা দেখে ডেঙ্গুর তীব্রতা নির্ধারণ করা যায় না। রোগীর রক্তচাপ, প্রস্রাবের পরিমাণ, পানিশূন্যতা, হেমাটোক্রিট এবং অন্যান্য শারীরিক লক্ষণও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর খাদ্যাভ্যাস ও পরিচর্যাঃ

ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর জন্য পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও শরীরে পানির ভারসাম্য বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি।
এ সময় স্বাভাবিক পানি, খাবার স্যালাইন, স্যুপ, ডাবের পানি এবং সহজপাচ্য পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করা যেতে পারে। তবে হৃদ্‌রোগ, কিডনি রোগ কিংবা অন্য কোনো কারণে তরল গ্রহণে বিধিনিষেধ থাকলে চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুসরণ করতে হবে।
জ্বর ও শরীরব্যথা নিয়ন্ত্রণে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্যারাসিটামল ব্যবহার করা যেতে পারে। অ্যাসপিরিন, আইবুপ্রোফেন ও ডাইক্লোফেনাক জাতীয় ব্যথানাশক ওষুধ পরিহার করতে হবে। কারণ এসব ওষুধ রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
ডেঙ্গুতে প্লাটিলেট বাড়ানোর উদ্দেশ্যে পেঁপে পাতার রস কিংবা কোনো বিশেষ ভেষজ বা বিকল্প ওষুধের ওপর নির্ভর করা উচিত নয়। এগুলোর কার্যকারিতা ও নিরাপত্তা পর্যাপ্তভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়।

যেসব লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে
ডেঙ্গুর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রোগের বিপদসংকেত সম্পর্কে সচেতন থাকা। বিশেষ করে জ্বর কমতে শুরু করার সময়ও রোগীর অবস্থা মারাত্মক হতে পারে।
নিম্নোক্ত লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে হাসপাতালে যেতে হবে—
১. তীব্র পেটব্যথা কিংবা পেটে অস্বাভাবিক অস্বস্তি।
২. বারবার বমি হওয়া।
৩. নাক, মাড়ি কিংবা শরীরের অন্য কোনো স্থান দিয়ে রক্তপাত।
৪. রক্তবমি অথবা কালো পায়খানা।
৫. অস্বাভাবিক দুর্বলতা, অস্থিরতা কিংবা অতিরিক্ত ঘুম ঘুম ভাব।
৬. শ্বাসকষ্ট, হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যাওয়া কিংবা মাথা ঘোরা।
৭. প্রস্রাবের পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে কমে যাওয়া।
বিশেষ করে শিশু, গর্ভবতী নারী, বয়স্ক ব্যক্তি এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন।

ডেঙ্গু প্রতিরোধে আমাদের করণীয়ঃ

ডেঙ্গু প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো এডিস মশার বংশবিস্তার রোধ করা। বাড়ির ছাদ, বারান্দা, ফুলের টব, পরিত্যক্ত টায়ার, ড্রাম এবং বিভিন্ন পাত্রে জমে থাকা পানি নিয়মিত অপসারণ করতে হবে।
এডিস মশা সাধারণত দিনের বেলায় বেশি সক্রিয় থাকে। তাই দিনের বেলাতেও মশারি ব্যবহার, শরীর ঢাকা পোশাক পরিধান এবং প্রয়োজন অনুযায়ী অনুমোদিত মশা প্রতিরোধক ব্যবহার করা উচিত।
শুধু ব্যক্তিগত উদ্যোগ নয়, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় প্রশাসন এবং সামাজিক সংগঠনগুলোর সমন্বিত প্রচেষ্টাও ডেঙ্গু প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
শেষ কথা
ডেঙ্গু জ্বরকে সাধারণ মৌসুমি জ্বর ভেবে অবহেলা করার সুযোগ নেই। প্রাথমিক অবস্থায় রোগ শনাক্ত করা, পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ, চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুসরণ এবং বিপদসংকেত দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যাওয়ার মাধ্যমে অনেক জটিলতা প্রতিরোধ করা সম্ভব।
হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসকসহ সব পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবাদাতার দায়িত্ব হলো রোগীকে সঠিক স্বাস্থ্যশিক্ষা প্রদান, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করাতে উৎসাহিত করা এবং ঝুঁকিপূর্ণ রোগীকে দ্রুত উপযুক্ত চিকিৎসাকেন্দ্রে পাঠানো।
মনে রাখতে হবে, চিকিৎসাপদ্ধতির চেয়েও রোগীর জীবন ও নিরাপত্তা সর্বাগ্রে। ডেঙ্গু মোকাবিলায় সচেতনতা, বিজ্ঞানসম্মত চিকিৎসা এবং সম্মিলিত সামাজিক উদ্যোগই হতে পারে আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি।

লেখক পরিচিতি:
ডাঃ আহসান হাবিব পাটওয়ারী,
ডি.এইচ.এম.এস, বি.এইচ.বি মাস্টার্স (রাষ্ট্রবিজ্ঞান) সরকারি রেজিস্ট্রেশন নং: ৪৮৬০৩
মেডিকেল অফিসার (গ্যাস্ট্রো-লিভার বিভাগ) স্পেশালাইজড হোমিওপ্যাথিক হাসপাতাল, চাঁদপুর শাখা।
যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, চাঁদপুর জেলা হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা কল্যাণ সমিতি।

চেম্বারঃ
আয়েশা হোমিও হল,
হাজী মহিন উদ্দিন টাওয়ার (নিচতলা), মেহের কালীবাড়ি দক্ষিণ বাজার (থানা রোড), শাহরাস্তি, চাঁদপুর।
মোবাইল: ০১৭৭৪-৯০৯৩৮৩, ০১৮৬৪-২৮৩১১৭

ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ

সোনাতলায় বিশ্ব হাত ধোয়া দিবস পালিত

ডেঙ্গু জ্বরে হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা কতটা কার্যকর? পরামর্শ দিলেন ডা. আহসান হাবিব পাটওয়ারী

আপডেট : ০১:২০:৪৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬

 

বাংলাদেশে ডেঙ্গু জ্বর ক্রমেই জনস্বাস্থ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে বর্ষা ও বর্ষা-পরবর্তী সময়ে এডিস মশার বিস্তার বেড়ে যাওয়ায় ডেঙ্গু সংক্রমণের ঝুঁকিও বৃদ্ধি পায়। তবে বর্তমানে ডেঙ্গু শুধু নির্দিষ্ট কোনো মৌসুমের রোগ হিসেবে সীমাবদ্ধ নেই। বছরের বিভিন্ন সময়েই এ রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ডেঙ্গু মূলত একটি ভাইরাসজনিত সংক্রামক রোগ, যা ডেঙ্গু ভাইরাসবাহী স্ত্রী এডিস মশার কামড়ের মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে। আক্রান্ত ব্যক্তির ক্ষেত্রে সাধারণ জ্বর থেকে শুরু করে মারাত্মক শারীরিক জটিলতাও দেখা দিতে পারে। তাই ডেঙ্গু সম্পর্কে সঠিক ধারণা, প্রাথমিক লক্ষণ শনাক্তকরণ এবং সময়মতো চিকিৎসা গ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ডেঙ্গু জ্বরের প্রাথমিক লক্ষণঃ

ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার সাধারণত ৪ থেকে ১০ দিনের মধ্যে উপসর্গ প্রকাশ পেতে পারে। রোগীর শরীরে হঠাৎ উচ্চমাত্রার জ্বর, প্রচণ্ড মাথাব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা, মাংসপেশি ও অস্থিসন্ধিতে ব্যথা, বমি বমি ভাব, ক্ষুধামন্দা এবং অতিরিক্ত দুর্বলতা দেখা দিতে পারে।
অনেক ক্ষেত্রে শরীরে লালচে ফুসকুড়িও দেখা যায়। তবে সব রোগীর ক্ষেত্রে একই ধরনের লক্ষণ প্রকাশ পায় না। কারও কারও সামান্য উপসর্গ থাকলেও পরবর্তী সময়ে জটিলতা তৈরি হতে পারে।

ডেঙ্গুতে হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসার ভূমিকাঃ

হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসাপদ্ধতিতে রোগীর ব্যক্তিগত লক্ষণ, শারীরিক অবস্থা এবং সামগ্রিক উপসর্গ বিবেচনা করে চিকিৎসা নির্বাচনের প্রচলন রয়েছে।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন—ডেঙ্গু ভাইরাস নির্মূল, রক্তের প্লাটিলেট বৃদ্ধি, রক্তক্ষরণ প্রতিরোধ কিংবা ডেঙ্গুর মারাত্মক জটিলতা নিরাময়ে কোনো হোমিওপ্যাথিক ওষুধের কার্যকারিতা নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক গবেষণায় প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
তাই ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর ক্ষেত্রে হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসাকে মূল চিকিৎসার বিকল্প হিসেবে গ্রহণ করা নিরাপদ নয়। কোনো রোগী সম্পূরক চিকিৎসা গ্রহণ করতে আগ্রহী হলে অবশ্যই সংশ্লিষ্ট চিকিৎসককে বিষয়টি জানাতে হবে। এতে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা, পর্যবেক্ষণ কিংবা হাসপাতালে ভর্তি হতে বিলম্ব করা যাবে না।
ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে রোগীর জীবনরক্ষা এবং জটিলতা প্রতিরোধই চিকিৎসার প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত।

রোগ নির্ণয়ে প্রয়োজনীয় পরীক্ষাঃ

ডেঙ্গুর উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত নিবন্ধিত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। রোগের সময়কাল ও শারীরিক অবস্থা বিবেচনায় চিকিৎসক প্রয়োজনীয় পরীক্ষা নির্ধারণ করবেন।
সাধারণত জ্বরের প্রথম পাঁচ দিনের মধ্যে NS1 Antigen পরীক্ষা কার্যকর হতে পারে। অন্যদিকে রোগের পরবর্তী পর্যায়ে IgM অ্যান্টিবডি পরীক্ষা প্রয়োজন হতে পারে।
পাশাপাশি CBC পরীক্ষার মাধ্যমে প্লাটিলেট, হেমাটোক্রিটসহ রক্তের বিভিন্ন উপাদানের পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করা হয়।
তবে মনে রাখতে হবে, শুধু প্লাটিলেটের সংখ্যা দেখে ডেঙ্গুর তীব্রতা নির্ধারণ করা যায় না। রোগীর রক্তচাপ, প্রস্রাবের পরিমাণ, পানিশূন্যতা, হেমাটোক্রিট এবং অন্যান্য শারীরিক লক্ষণও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর খাদ্যাভ্যাস ও পরিচর্যাঃ

ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর জন্য পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও শরীরে পানির ভারসাম্য বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি।
এ সময় স্বাভাবিক পানি, খাবার স্যালাইন, স্যুপ, ডাবের পানি এবং সহজপাচ্য পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করা যেতে পারে। তবে হৃদ্‌রোগ, কিডনি রোগ কিংবা অন্য কোনো কারণে তরল গ্রহণে বিধিনিষেধ থাকলে চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুসরণ করতে হবে।
জ্বর ও শরীরব্যথা নিয়ন্ত্রণে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্যারাসিটামল ব্যবহার করা যেতে পারে। অ্যাসপিরিন, আইবুপ্রোফেন ও ডাইক্লোফেনাক জাতীয় ব্যথানাশক ওষুধ পরিহার করতে হবে। কারণ এসব ওষুধ রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
ডেঙ্গুতে প্লাটিলেট বাড়ানোর উদ্দেশ্যে পেঁপে পাতার রস কিংবা কোনো বিশেষ ভেষজ বা বিকল্প ওষুধের ওপর নির্ভর করা উচিত নয়। এগুলোর কার্যকারিতা ও নিরাপত্তা পর্যাপ্তভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়।

যেসব লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে
ডেঙ্গুর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রোগের বিপদসংকেত সম্পর্কে সচেতন থাকা। বিশেষ করে জ্বর কমতে শুরু করার সময়ও রোগীর অবস্থা মারাত্মক হতে পারে।
নিম্নোক্ত লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে হাসপাতালে যেতে হবে—
১. তীব্র পেটব্যথা কিংবা পেটে অস্বাভাবিক অস্বস্তি।
২. বারবার বমি হওয়া।
৩. নাক, মাড়ি কিংবা শরীরের অন্য কোনো স্থান দিয়ে রক্তপাত।
৪. রক্তবমি অথবা কালো পায়খানা।
৫. অস্বাভাবিক দুর্বলতা, অস্থিরতা কিংবা অতিরিক্ত ঘুম ঘুম ভাব।
৬. শ্বাসকষ্ট, হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যাওয়া কিংবা মাথা ঘোরা।
৭. প্রস্রাবের পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে কমে যাওয়া।
বিশেষ করে শিশু, গর্ভবতী নারী, বয়স্ক ব্যক্তি এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন।

ডেঙ্গু প্রতিরোধে আমাদের করণীয়ঃ

ডেঙ্গু প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো এডিস মশার বংশবিস্তার রোধ করা। বাড়ির ছাদ, বারান্দা, ফুলের টব, পরিত্যক্ত টায়ার, ড্রাম এবং বিভিন্ন পাত্রে জমে থাকা পানি নিয়মিত অপসারণ করতে হবে।
এডিস মশা সাধারণত দিনের বেলায় বেশি সক্রিয় থাকে। তাই দিনের বেলাতেও মশারি ব্যবহার, শরীর ঢাকা পোশাক পরিধান এবং প্রয়োজন অনুযায়ী অনুমোদিত মশা প্রতিরোধক ব্যবহার করা উচিত।
শুধু ব্যক্তিগত উদ্যোগ নয়, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় প্রশাসন এবং সামাজিক সংগঠনগুলোর সমন্বিত প্রচেষ্টাও ডেঙ্গু প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
শেষ কথা
ডেঙ্গু জ্বরকে সাধারণ মৌসুমি জ্বর ভেবে অবহেলা করার সুযোগ নেই। প্রাথমিক অবস্থায় রোগ শনাক্ত করা, পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ, চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুসরণ এবং বিপদসংকেত দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যাওয়ার মাধ্যমে অনেক জটিলতা প্রতিরোধ করা সম্ভব।
হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসকসহ সব পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবাদাতার দায়িত্ব হলো রোগীকে সঠিক স্বাস্থ্যশিক্ষা প্রদান, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করাতে উৎসাহিত করা এবং ঝুঁকিপূর্ণ রোগীকে দ্রুত উপযুক্ত চিকিৎসাকেন্দ্রে পাঠানো।
মনে রাখতে হবে, চিকিৎসাপদ্ধতির চেয়েও রোগীর জীবন ও নিরাপত্তা সর্বাগ্রে। ডেঙ্গু মোকাবিলায় সচেতনতা, বিজ্ঞানসম্মত চিকিৎসা এবং সম্মিলিত সামাজিক উদ্যোগই হতে পারে আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি।

লেখক পরিচিতি:
ডাঃ আহসান হাবিব পাটওয়ারী,
ডি.এইচ.এম.এস, বি.এইচ.বি মাস্টার্স (রাষ্ট্রবিজ্ঞান) সরকারি রেজিস্ট্রেশন নং: ৪৮৬০৩
মেডিকেল অফিসার (গ্যাস্ট্রো-লিভার বিভাগ) স্পেশালাইজড হোমিওপ্যাথিক হাসপাতাল, চাঁদপুর শাখা।
যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, চাঁদপুর জেলা হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা কল্যাণ সমিতি।

চেম্বারঃ
আয়েশা হোমিও হল,
হাজী মহিন উদ্দিন টাওয়ার (নিচতলা), মেহের কালীবাড়ি দক্ষিণ বাজার (থানা রোড), শাহরাস্তি, চাঁদপুর।
মোবাইল: ০১৭৭৪-৯০৯৩৮৩, ০১৮৬৪-২৮৩১১৭