ঢাকা ০৭:৩৬ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সোনারগাঁয়ে দখল-দূষণে প্রাণহীন মারিখালী নদ

  • ডেস্ক নিউজ
  • আপডেট : ০৮:০৬:৫১ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৭ মার্চ ২০২৪
  • 46

ব্রহ্মপুত্রের শাখা নদ মারিখালী। নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া এই নদের এখন মরণ দশা। দখল-দূষণ আর নাব্যসংকটের কারণে এটি এখন বিলীন হওয়ার পথে। অথচ একসময়ের খরস্রোতা এ নদ দিয়ে লঞ্চ যেত মেঘনায়। স্রোতস্বিনী এই নদের সেই জৌলুস এখন আর নেই। স্থানীয়রা বলছেন, এই নদের পানি দিয়ে তারা একসময় ফসল ফলাতেন। কিন্তু শিল্পের বর্জ্যে কালচে রঙ ধারণ করা পানি এখন কোনো কাজে লাগানো যায় না। নদ চলে গেছে প্রভাবশালীদের দখলে। এখনই কোনো ব্যবস্থা না নেওয়া হলে কয়েক বছরের মধ্যে নদটি বিলীন হয়ে যাবে। আর সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা দিয়েছেন অভিযান চালিয়ে দখলমুক্ত করার আশ্বাস।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উপজেলার বৈদ্যের বাজার ইউনিয়নের মেঘনা নদীর কোলঘেঁষে শুরু হয়ে সোনারগাঁ পৌরসভা, পিরোজপুর, মোগরাপাড়া ইউনিয়নের কাইকারটেকের ঐতিহাসিক হাটের পাশ দিয়ে ব্রহ্মপুত্র নদে গিয়ে মিশেছে মারিখালী। দীর্ঘ আট কিলোমিটার দৈর্ঘ্য ও গড়ে ৪২ মিটার প্রস্থের নদটির ওপর দিয়ে যাতায়াতের জন্য বিভিন্ন স্থানে ছয়টি সেতু নির্মাণ করেছে সড়ক ও জনপথ বিভাগ (সওজ) এবং এলজিইডি। এ ছাড়া ময়লা আবর্জনা জমে থাকায় নদ হারিয়েছে তার নাব্য। মারিখালীর স্বচ্ছ পানি এখন কালচে রং ধারণ করেছে। দূষণের পরিমাণ দিন দিন বেড়েই চলেছে। অথচ এক সময় বিভিন্ন প্রজাতির মিঠা পানির মাছের বসবাস ছিল এখানে। স্থানীয়রা জানান, এ নদকে ঘিরে উপজেলার কমপক্ষে ৩০টি গ্রামের প্রায় অর্ধ লক্ষাধিক মানুষের বসতি গড়ে ওঠে।

উপজেলার পিরোজপুর ইউনিয়নের কৃষক আব্দুর রশিদ বলেন, ‘আগে মারিখালী নদের পানি দিয়ে ফসল ফলাতাম। কিন্তু কলকারখানার বর্জ্যে ওই পানি এখন নষ্ট হয়ে গেছে। প্রভাবশালীদের দখলে চলে যাওয়ায় নদ এখন আর আগের মতো নেই।’

পৌরসভার বাসিন্দা ষাটোর্ধ্ব মুজিবুর রহমান বলেন, ‘শিল্প এলাকার পানি এই নদে ফেলা হয়। নদের দুই তীরে বাড়িঘরসহ অসংখ্য স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে। এগুলোর পেছনে স্থানীয় প্রভাবশালীদের হাত রয়েছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে নদটি আগের অবস্থায় ফিরিয়ে না আনলে আমার মতো লক্ষাধিক মানুষের জীবনে বিপর্যয় নেমে আসবে। এখনই খনন শুরু না করলে কয়েক বছরের মধ্যে নদটি বিলীন হয়ে যাবে।’

উপজেলার পরিবেশ রক্ষা ও উন্নয়ন সোসাইটির সভাপতি আজিজুল ইসলাম মুকুল বলেন, ‘সোনারগাঁয়ের অসংখ্য নদ-নদী এভাবেই মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। এ বিষয়ে প্রশাসনকে উদ্যোগ নিতে হবে। স্থানীয় প্রশাসন গত বছর সাহাপুর কাঠপট্টি এলাকায় নদে সিমেন্টের খুঁটি বসানোর অভিযোগে একজনকে নোটিশ দিয়েছিল; কিন্তু কোনো উচ্ছেদ অভিযান চালায়নি। এ কারণে নদ দখলমুক্ত হয়নি। এ ছাড়া নদের মেঘনার মুখ অংশ বালু দিয়ে প্রভাবশালীরা প্রায় বন্ধ করে ফেলছেন।’ তাদের বিরুদ্ধে বিআইডব্লিউটিএর উদ্যোগ দাবি করেন তিনি।

মারিখালী নদ দখলমুক্ত করার বিষয়ে জানতে চাইলে সোনারগাঁ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল মাহফুজ বলেন, ‘শিগগিরই আমরা অভিযানে নামব। নদের ওপরে যত স্থাপনা রয়েছে, সব ভেঙে দেওয়া হবে। এ ছাড়া নদ দূষণের সঙ্গে যারা জড়িত তাদের বিরুদ্ধেও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

নদটিকে আগের রূপে ফিরিয়ে আনতে খননের উদ্যোগ নেওয়া হবে জানিয়ে বিআইডব্লিউটিএর নারায়ণগঞ্জের উপপরিচালক মোহাম্মদ মোবারক হোসেন বলেন, ‘স্থানীয় সংসদ সদস্যের চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে কিছুদিন আগেই খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এখন ড্রেজিং বিভাগ অনুমতি দিলেই আমরা কাজে নামব।’

দ্রুত খননকাজ শুরুর জন্য সংশ্লিষ্ট বিভাগকে তাগাদা দেওয়া হচ্ছে জানিয়ে নারায়ণগঞ্জ-৩ (সোনারগাঁ) আসনের সংসদ সদস্য কায়সার হাসনাত বলেন, ‘মারিখালী নদের নাব্য ফিরিয়ে আনতে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে একাধিকবার কথা হয়েছে। চিঠি দিয়ে অনুরোধ জানানোর পর তারা খননের উদ্যোগ নিয়েছে। দ্রুত কাজ শুরু করতে বারবার তাগাদা দিচ্ছি। আশা করছি মারিখালী আবার জেগে উঠবে।’

ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ

কচুয়ায় ফ্রি ভেটেরিনারি মেডিকেল ক্যাম্প অনুষ্ঠিত: বিনামূল্যে টিকা ও কৃমিনাশক প্রদান

সোনারগাঁয়ে দখল-দূষণে প্রাণহীন মারিখালী নদ

আপডেট : ০৮:০৬:৫১ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৭ মার্চ ২০২৪

ব্রহ্মপুত্রের শাখা নদ মারিখালী। নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া এই নদের এখন মরণ দশা। দখল-দূষণ আর নাব্যসংকটের কারণে এটি এখন বিলীন হওয়ার পথে। অথচ একসময়ের খরস্রোতা এ নদ দিয়ে লঞ্চ যেত মেঘনায়। স্রোতস্বিনী এই নদের সেই জৌলুস এখন আর নেই। স্থানীয়রা বলছেন, এই নদের পানি দিয়ে তারা একসময় ফসল ফলাতেন। কিন্তু শিল্পের বর্জ্যে কালচে রঙ ধারণ করা পানি এখন কোনো কাজে লাগানো যায় না। নদ চলে গেছে প্রভাবশালীদের দখলে। এখনই কোনো ব্যবস্থা না নেওয়া হলে কয়েক বছরের মধ্যে নদটি বিলীন হয়ে যাবে। আর সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা দিয়েছেন অভিযান চালিয়ে দখলমুক্ত করার আশ্বাস।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উপজেলার বৈদ্যের বাজার ইউনিয়নের মেঘনা নদীর কোলঘেঁষে শুরু হয়ে সোনারগাঁ পৌরসভা, পিরোজপুর, মোগরাপাড়া ইউনিয়নের কাইকারটেকের ঐতিহাসিক হাটের পাশ দিয়ে ব্রহ্মপুত্র নদে গিয়ে মিশেছে মারিখালী। দীর্ঘ আট কিলোমিটার দৈর্ঘ্য ও গড়ে ৪২ মিটার প্রস্থের নদটির ওপর দিয়ে যাতায়াতের জন্য বিভিন্ন স্থানে ছয়টি সেতু নির্মাণ করেছে সড়ক ও জনপথ বিভাগ (সওজ) এবং এলজিইডি। এ ছাড়া ময়লা আবর্জনা জমে থাকায় নদ হারিয়েছে তার নাব্য। মারিখালীর স্বচ্ছ পানি এখন কালচে রং ধারণ করেছে। দূষণের পরিমাণ দিন দিন বেড়েই চলেছে। অথচ এক সময় বিভিন্ন প্রজাতির মিঠা পানির মাছের বসবাস ছিল এখানে। স্থানীয়রা জানান, এ নদকে ঘিরে উপজেলার কমপক্ষে ৩০টি গ্রামের প্রায় অর্ধ লক্ষাধিক মানুষের বসতি গড়ে ওঠে।

উপজেলার পিরোজপুর ইউনিয়নের কৃষক আব্দুর রশিদ বলেন, ‘আগে মারিখালী নদের পানি দিয়ে ফসল ফলাতাম। কিন্তু কলকারখানার বর্জ্যে ওই পানি এখন নষ্ট হয়ে গেছে। প্রভাবশালীদের দখলে চলে যাওয়ায় নদ এখন আর আগের মতো নেই।’

পৌরসভার বাসিন্দা ষাটোর্ধ্ব মুজিবুর রহমান বলেন, ‘শিল্প এলাকার পানি এই নদে ফেলা হয়। নদের দুই তীরে বাড়িঘরসহ অসংখ্য স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে। এগুলোর পেছনে স্থানীয় প্রভাবশালীদের হাত রয়েছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে নদটি আগের অবস্থায় ফিরিয়ে না আনলে আমার মতো লক্ষাধিক মানুষের জীবনে বিপর্যয় নেমে আসবে। এখনই খনন শুরু না করলে কয়েক বছরের মধ্যে নদটি বিলীন হয়ে যাবে।’

উপজেলার পরিবেশ রক্ষা ও উন্নয়ন সোসাইটির সভাপতি আজিজুল ইসলাম মুকুল বলেন, ‘সোনারগাঁয়ের অসংখ্য নদ-নদী এভাবেই মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। এ বিষয়ে প্রশাসনকে উদ্যোগ নিতে হবে। স্থানীয় প্রশাসন গত বছর সাহাপুর কাঠপট্টি এলাকায় নদে সিমেন্টের খুঁটি বসানোর অভিযোগে একজনকে নোটিশ দিয়েছিল; কিন্তু কোনো উচ্ছেদ অভিযান চালায়নি। এ কারণে নদ দখলমুক্ত হয়নি। এ ছাড়া নদের মেঘনার মুখ অংশ বালু দিয়ে প্রভাবশালীরা প্রায় বন্ধ করে ফেলছেন।’ তাদের বিরুদ্ধে বিআইডব্লিউটিএর উদ্যোগ দাবি করেন তিনি।

মারিখালী নদ দখলমুক্ত করার বিষয়ে জানতে চাইলে সোনারগাঁ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল মাহফুজ বলেন, ‘শিগগিরই আমরা অভিযানে নামব। নদের ওপরে যত স্থাপনা রয়েছে, সব ভেঙে দেওয়া হবে। এ ছাড়া নদ দূষণের সঙ্গে যারা জড়িত তাদের বিরুদ্ধেও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

নদটিকে আগের রূপে ফিরিয়ে আনতে খননের উদ্যোগ নেওয়া হবে জানিয়ে বিআইডব্লিউটিএর নারায়ণগঞ্জের উপপরিচালক মোহাম্মদ মোবারক হোসেন বলেন, ‘স্থানীয় সংসদ সদস্যের চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে কিছুদিন আগেই খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এখন ড্রেজিং বিভাগ অনুমতি দিলেই আমরা কাজে নামব।’

দ্রুত খননকাজ শুরুর জন্য সংশ্লিষ্ট বিভাগকে তাগাদা দেওয়া হচ্ছে জানিয়ে নারায়ণগঞ্জ-৩ (সোনারগাঁ) আসনের সংসদ সদস্য কায়সার হাসনাত বলেন, ‘মারিখালী নদের নাব্য ফিরিয়ে আনতে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে একাধিকবার কথা হয়েছে। চিঠি দিয়ে অনুরোধ জানানোর পর তারা খননের উদ্যোগ নিয়েছে। দ্রুত কাজ শুরু করতে বারবার তাগাদা দিচ্ছি। আশা করছি মারিখালী আবার জেগে উঠবে।’