ঢাকা ১১:০৬ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শাহারাস্তিতে সরকারি অর্থ গিলে খেল ঠিকাদার–পিআইও: ব্রিজের অর্ধেক কাজ করে, পুরো টাকা গায়েব

  • ডেস্ক নিউজ
  • আপডেট : ০৭:১২:৫০ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৫ অগাস্ট ২০২৫
  • 95

কাজ অর্ধেক, পুরো টাকা গায়েব ! — শাহারাস্তির কোটি টাকার ব্রিজ প্রকল্পে চলছে প্রকাশ্য লুটপাট। সরকারি অর্থ উন্নয়নের নামে গিলে খাচ্ছে দুর্নীতির দানব, অথচ এর ভোগান্তির বোঝা বইছে সাধারণ মানুষ। ব্রিজের ভরাট-ঢালাই অসমাপ্ত রেখেই ঠিকাদার তুলে নিয়েছে পুরো বিল, আর এই অনিয়মে প্রত্যক্ষ সহযোগী হয়েছেন উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও)।

জানা যায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও এাণ মন্ত্রনালয়ের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি’র আওতায় গ্রামীণ রাস্তায় ১৫ মিটার দৈর্ঘ্যের সেতু/ কালভার্ট নির্মাণ প্রকল্পের আওতায় শাহারাস্তি উপজেলায় গ্রামীণ সড়কে ৮টি ব্রিজ নির্মাণের জন্য ২ কোটি ৩৫ লক্ষ ২৬ হাজার টাকার একটি প্যাকেজ অনুমোদন হয়। টেন্ডার পায় হাইমচরের প্রতিষ্ঠান হাডু এন্টারপ্রাইজ, আর মাঠে কাজ পরিচালনা করছে শাহরাস্তির মেসকাত নামে এক সাব ঠিকাদার।

অনুসন্ধানে জানা যায়, সুচিপাড়া দক্ষিণ ইউনিয়নের দশনাপাড়া বেপারী বাড়ির সামনে ৩০ ফুট দৈর্ঘ্যের ব্রিজ ৩৩ লক্ষ ১৭ হাজার টাকা ব্যয়ে নির্মাণের কথা ছিল। কিন্তু অর্ধেক কাজ শেষ করেই পুরো টাকা তুলেছে প্রতিষ্ঠানটি। একইভাবে, সুচিপাড়া উত্তর ইউনিয়নের পাড়ানগর মিজি বাড়ির ব্রিজ (ব্যয় ২৯ লক্ষ ৯৭ হাজার টাকা) ৮০ শতাংশ কাজ শেষ হলেও পুরো বিল উত্তোলন করা হয়েছে।

যেখানে নিয়ম অনুযায়ী কাজ শেষ হওয়ার পর মান ও কার্যকারিতা যাচাই করে টাকা ছাড় করার কথা, সেখানে কাজ অসমাপ্ত রেখেই ঠিকাদার বিল পেয়ে গেছে। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে— বদলির আগে নিজের কমিশন বাগিয়ে নিতে তড়িঘড়ি করে বিল ছাড় করেছেন সাবেক পিআইও সবুজ তালুকদার।

বৃহস্পতিবার (২১ আগস্ট) সরজমিন গিয়ে দেখা যায়, দশনাপাড়া ব্রিজের দুই পাশের রেলিং ও চাদ ঢালাই করা হয়নি। এখনো সেন্টারিং করে ফেলে রাখা হয়েছে। গত এক বছর ধরে কাজ বন্ধ থাকায় গ্রামবাসীর দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে।

স্থানীয় বাসিন্দা শরীফ বলেন— “এখানে একদিন কাজ করলে ১৫ দিন বন্ধ থাকে। বছরের পর বছর কাজ শেষ না করায় এখনো বাঁশের সাঁকো দিয়ে চলতে হয়। বাচ্চারা পানিতে পড়ে যায়। অথচ পুরো বিল তুলে নিয়েছে ঠিকাদার। আমরা এর বিচার চাই।”

একই চিত্র পাড়ানগর মিজি বাড়ির ব্রিজেও। পাশের মাটি ফেলা হয়নি, রেলিং হয়নি। ৩০ লাখ টাকার ব্রিজে আজও বাঁশের ভরসায় মানুষ পারাপার করছে।

স্থানীয় দেলোয়ার হোসেন বলেন—“কষ্ট লাঘব হবে ভেবে খুশি হয়েছিলাম। কিন্তু মাঝপথে কাজ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আগের চেয়ে দুর্ভোগ বেড়েছে। বর্ষায় চলাচলই অসম্ভব।”

শিশুদের ঝুঁকি নিয়ে অভিভাবক রওশন আক্তার বলেন—“স্কুলে যেতে কাঠের সাঁকো পার হতে গিয়ে বাচ্চাদের দুর্ঘটনার শঙ্কা থাকে। অথচ সরকার টাকা দিয়েছে, কাজ শুরু হয়েছিল—কিন্তু শেষ হয়নি।”

স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছেন, পিআইও অফিসের আঁতাত ছাড়া এভাবে কাজের অগ্রগতি যাচাই না করে বিল ছাড় সম্ভব নয়। একজন সাবেক জনপ্রতিনিধি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন—

“ঠিকাদার আর পিআইও অফিসের কমিশন বাণিজ্য ছাড়া এ ধরনের অনিয়ম হতে পারে না।”

এ বিষয়ে সাবেক পিআইও সবুজ তালুকদার মুঠোফোনে বলেন—“ মেশকাতকে কাজ শেষ করতে বলেছি। আপনার সাথে সরাসরি বসে বিস্তারিত বলব।” তবে তিনি নিজের অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেন।

এ বিষয়ে জানতে সাব ঠিকাদার মেশকাতরের মন্তব্য জানতে কল করলে তিনি সরাসরি সাক্ষাতের অনুরোধ করে মন্তব্য এড়িয়ে যান।

বর্তমানে অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত পিআইও মোহাম্মদ আশেকুর রহমান বলেন—“আমি মাত্র ২১ দিন হলো দায়িত্ব নিয়েছি। অভিযোগের ভিত্তিতে সরজমিনে গিয়ে দেখেছি, অনেক কাজ বাকি আছে অথচ সব বিল উত্তোলন হয়ে গেছে। এগুলো আমার সময়ের নয়।”

শাহারাস্তি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নাজিয়া হোসেন বলেন— বিষয়টি আমি আপনার মাধ্যমে জানলাম। আমি এ বিষয়ে খোঁজখবর নিবো, যাচাই-বাছাই করে কেউ যদি দায়ী থাকে তার বিরুদ্ধে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেব।

ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ

কচুয়ায় ফ্রি ভেটেরিনারি মেডিকেল ক্যাম্প অনুষ্ঠিত: বিনামূল্যে টিকা ও কৃমিনাশক প্রদান

শাহারাস্তিতে সরকারি অর্থ গিলে খেল ঠিকাদার–পিআইও: ব্রিজের অর্ধেক কাজ করে, পুরো টাকা গায়েব

আপডেট : ০৭:১২:৫০ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৫ অগাস্ট ২০২৫

কাজ অর্ধেক, পুরো টাকা গায়েব ! — শাহারাস্তির কোটি টাকার ব্রিজ প্রকল্পে চলছে প্রকাশ্য লুটপাট। সরকারি অর্থ উন্নয়নের নামে গিলে খাচ্ছে দুর্নীতির দানব, অথচ এর ভোগান্তির বোঝা বইছে সাধারণ মানুষ। ব্রিজের ভরাট-ঢালাই অসমাপ্ত রেখেই ঠিকাদার তুলে নিয়েছে পুরো বিল, আর এই অনিয়মে প্রত্যক্ষ সহযোগী হয়েছেন উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও)।

জানা যায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও এাণ মন্ত্রনালয়ের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি’র আওতায় গ্রামীণ রাস্তায় ১৫ মিটার দৈর্ঘ্যের সেতু/ কালভার্ট নির্মাণ প্রকল্পের আওতায় শাহারাস্তি উপজেলায় গ্রামীণ সড়কে ৮টি ব্রিজ নির্মাণের জন্য ২ কোটি ৩৫ লক্ষ ২৬ হাজার টাকার একটি প্যাকেজ অনুমোদন হয়। টেন্ডার পায় হাইমচরের প্রতিষ্ঠান হাডু এন্টারপ্রাইজ, আর মাঠে কাজ পরিচালনা করছে শাহরাস্তির মেসকাত নামে এক সাব ঠিকাদার।

অনুসন্ধানে জানা যায়, সুচিপাড়া দক্ষিণ ইউনিয়নের দশনাপাড়া বেপারী বাড়ির সামনে ৩০ ফুট দৈর্ঘ্যের ব্রিজ ৩৩ লক্ষ ১৭ হাজার টাকা ব্যয়ে নির্মাণের কথা ছিল। কিন্তু অর্ধেক কাজ শেষ করেই পুরো টাকা তুলেছে প্রতিষ্ঠানটি। একইভাবে, সুচিপাড়া উত্তর ইউনিয়নের পাড়ানগর মিজি বাড়ির ব্রিজ (ব্যয় ২৯ লক্ষ ৯৭ হাজার টাকা) ৮০ শতাংশ কাজ শেষ হলেও পুরো বিল উত্তোলন করা হয়েছে।

যেখানে নিয়ম অনুযায়ী কাজ শেষ হওয়ার পর মান ও কার্যকারিতা যাচাই করে টাকা ছাড় করার কথা, সেখানে কাজ অসমাপ্ত রেখেই ঠিকাদার বিল পেয়ে গেছে। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে— বদলির আগে নিজের কমিশন বাগিয়ে নিতে তড়িঘড়ি করে বিল ছাড় করেছেন সাবেক পিআইও সবুজ তালুকদার।

বৃহস্পতিবার (২১ আগস্ট) সরজমিন গিয়ে দেখা যায়, দশনাপাড়া ব্রিজের দুই পাশের রেলিং ও চাদ ঢালাই করা হয়নি। এখনো সেন্টারিং করে ফেলে রাখা হয়েছে। গত এক বছর ধরে কাজ বন্ধ থাকায় গ্রামবাসীর দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে।

স্থানীয় বাসিন্দা শরীফ বলেন— “এখানে একদিন কাজ করলে ১৫ দিন বন্ধ থাকে। বছরের পর বছর কাজ শেষ না করায় এখনো বাঁশের সাঁকো দিয়ে চলতে হয়। বাচ্চারা পানিতে পড়ে যায়। অথচ পুরো বিল তুলে নিয়েছে ঠিকাদার। আমরা এর বিচার চাই।”

একই চিত্র পাড়ানগর মিজি বাড়ির ব্রিজেও। পাশের মাটি ফেলা হয়নি, রেলিং হয়নি। ৩০ লাখ টাকার ব্রিজে আজও বাঁশের ভরসায় মানুষ পারাপার করছে।

স্থানীয় দেলোয়ার হোসেন বলেন—“কষ্ট লাঘব হবে ভেবে খুশি হয়েছিলাম। কিন্তু মাঝপথে কাজ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আগের চেয়ে দুর্ভোগ বেড়েছে। বর্ষায় চলাচলই অসম্ভব।”

শিশুদের ঝুঁকি নিয়ে অভিভাবক রওশন আক্তার বলেন—“স্কুলে যেতে কাঠের সাঁকো পার হতে গিয়ে বাচ্চাদের দুর্ঘটনার শঙ্কা থাকে। অথচ সরকার টাকা দিয়েছে, কাজ শুরু হয়েছিল—কিন্তু শেষ হয়নি।”

স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছেন, পিআইও অফিসের আঁতাত ছাড়া এভাবে কাজের অগ্রগতি যাচাই না করে বিল ছাড় সম্ভব নয়। একজন সাবেক জনপ্রতিনিধি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন—

“ঠিকাদার আর পিআইও অফিসের কমিশন বাণিজ্য ছাড়া এ ধরনের অনিয়ম হতে পারে না।”

এ বিষয়ে সাবেক পিআইও সবুজ তালুকদার মুঠোফোনে বলেন—“ মেশকাতকে কাজ শেষ করতে বলেছি। আপনার সাথে সরাসরি বসে বিস্তারিত বলব।” তবে তিনি নিজের অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেন।

এ বিষয়ে জানতে সাব ঠিকাদার মেশকাতরের মন্তব্য জানতে কল করলে তিনি সরাসরি সাক্ষাতের অনুরোধ করে মন্তব্য এড়িয়ে যান।

বর্তমানে অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত পিআইও মোহাম্মদ আশেকুর রহমান বলেন—“আমি মাত্র ২১ দিন হলো দায়িত্ব নিয়েছি। অভিযোগের ভিত্তিতে সরজমিনে গিয়ে দেখেছি, অনেক কাজ বাকি আছে অথচ সব বিল উত্তোলন হয়ে গেছে। এগুলো আমার সময়ের নয়।”

শাহারাস্তি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নাজিয়া হোসেন বলেন— বিষয়টি আমি আপনার মাধ্যমে জানলাম। আমি এ বিষয়ে খোঁজখবর নিবো, যাচাই-বাছাই করে কেউ যদি দায়ী থাকে তার বিরুদ্ধে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেব।