ঢাকা ০৮:৫৭ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আল জাজিরার প্রতিবেদন:

আসন্ন নির্বাচনে ক্ষমতায় আসতে পারে জামায়াতে ইসলামী

  • ডেস্ক নিউজ
  • আপডেট : ০৮:৩২:৩৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ২১ জানুয়ারী ২০২৬
  • 195

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য সাধারণ নির্বাচনকে সামনে রেখে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এখন তাদের রাজনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তের মুখোমুখি। ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর এটিই হতে যাচ্ছে দেশের প্রথম জাতীয় নির্বাচন, যা রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে।

ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করায় এবারের নির্বাচন কার্যত দ্বিমুখী প্রতিযোগিতায় রূপ নিয়েছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আল-জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফ্রন্টরানার হিসেবে বিবেচিত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে উঠে এসেছে জামায়াত, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এবং কয়েকটি ইসলামি দলের সমন্বয়ে গঠিত একটি নতুন নির্বাচনী জোট।

জনমত জরিপে ব্যবধান কমছে

সাম্প্রতিক জনমত জরিপগুলো জামায়াতের আত্মবিশ্বাস আরও দৃঢ় করেছে। গত ডিসেম্বর মাসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউট (আইআরআই)-এর জরিপে দেখা যায়, বিএনপির জনসমর্থন ৩৩ শতাংশ, আর জামায়াতের ২৯ শতাংশ।

এরপর গত সপ্তাহে প্রকাশিত বাংলাদেশের কয়েকটি সংস্থার যৌথ জরিপে ব্যবধান আরও কমে আসে। সেখানে বিএনপির সমর্থন দাঁড়ায় ৩৪ দশমিক ৭ শতাংশে, আর জামায়াতের সমর্থন ৩৩ দশমিক ৬ শতাংশে।

নাটকীয় প্রত্যাবর্তনের পথে?

বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াত যদি এবারের নির্বাচনে জয়ী হয়, তবে সেটি হবে দলটির জন্য এক চরম নাটকীয় প্রত্যাবর্তন। গত দেড় দশকে দলটি কঠোর দমন-পীড়নের শিকার হয়েছে। মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে দলটির শীর্ষ অনেক নেতার ফাঁসি কিংবা দীর্ঘ কারাদণ্ড হয়েছে।

১৯৪১ সালে সৈয়দ আবুল আলা মওদুদী কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত জামায়াত ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল—যা আজও দেশের একটি বড় অংশের মানুষের মনে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। তবে বর্তমান নেতৃত্বের দাবি, দীর্ঘদিনের নিপীড়ন তাদের প্রতি জনসমর্থন ও সহানুভূতি বাড়িয়েছে।

‘নতুন রাজনৈতিক শক্তি’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ

জামায়াতের নায়েবে আমির ড. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের আল-জাজিরাকে বলেন,

“বাংলাদেশের মানুষ ৫৫ বছর ধরে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির শাসন দেখেছে। এখন তারা একটি নতুন রাজনৈতিক শক্তিকে ক্ষমতায় দেখতে চায়।”

নিজেদের ‘মধ্যপন্থী ইসলামি শক্তি’ হিসেবে তুলে ধরতে জামায়াত এবারের নির্বাচনে নতুন কৌশল নিয়েছে। খুলনার মতো এলাকায় কৃষ্ণ নন্দী নামে একজন হিন্দু প্রার্থীকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে, যা সংখ্যালঘু ভোটারদের আকৃষ্ট করার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

উদ্বেগ ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া

তবে জামায়াতের সম্ভাব্য ক্ষমতায় আসা নিয়ে দেশি ও আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগও রয়েছে। অনেকের আশঙ্কা, ইসলামি দল ক্ষমতায় এলে শরিয়া আইন কার্যকর হতে পারে কিংবা নারী ও সংখ্যালঘুদের অধিকার সংকুচিত হতে পারে। যদিও জামায়াত নেতারা দাবি করছেন, তারা বিদ্যমান ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধানের মধ্যেই সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়ন করবেন।

আন্তর্জাতিক ক্রাইসিস গ্রুপের সিনিয়র কনসালটেন্ট থমাস কিনের মতে, জামায়াত ক্ষমতায় এলে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। বিশেষ করে ভারতের বিজেপি সরকারের সঙ্গে আদর্শিক দ্বন্দ্ব দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে প্রভাব ফেলতে পারে। অন্যদিকে, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক পুনর্গঠনের উদ্যোগ জামায়াতের জন্য ইতিবাচক হতে পারে।

সাংগঠনিক শক্তিতে আত্মবিশ্বাস

জামায়াতের সাংগঠনিক কাঠামো বর্তমানে বেশ সুসংহত বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। দলটির ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবির সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছে।

জামায়াত নেতাদের দাবি অনুযায়ী, দলটির প্রায় ২ কোটি সমর্থক এবং ২ লাখ ৫০ হাজার নিবন্ধিত ‘রুকন’ বা সদস্য রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এবারের নির্বাচন কেবল একটি ভোট নয়—বরং এটি হবে জামায়াতের জাতীয় গ্রহণযোগ্যতা অর্জনের একটি কঠিন পরীক্ষা।

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির ভোটই নির্ধারণ করবে, দীর্ঘদিন ধরে বিতর্কের কেন্দ্রে থাকা এই দলটি তাদের সাংগঠনিক ধৈর্য ও রাজনৈতিক সংগ্রামকে রাষ্ট্রীয় বৈধতায় রূপান্তর করতে পারবে কি না।

সূত্র: আল জাজিরা

 

ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ

কচুয়ায় ফ্রি ভেটেরিনারি মেডিকেল ক্যাম্প অনুষ্ঠিত: বিনামূল্যে টিকা ও কৃমিনাশক প্রদান

আল জাজিরার প্রতিবেদন:

আসন্ন নির্বাচনে ক্ষমতায় আসতে পারে জামায়াতে ইসলামী

আপডেট : ০৮:৩২:৩৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ২১ জানুয়ারী ২০২৬

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য সাধারণ নির্বাচনকে সামনে রেখে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এখন তাদের রাজনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তের মুখোমুখি। ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর এটিই হতে যাচ্ছে দেশের প্রথম জাতীয় নির্বাচন, যা রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে।

ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করায় এবারের নির্বাচন কার্যত দ্বিমুখী প্রতিযোগিতায় রূপ নিয়েছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আল-জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফ্রন্টরানার হিসেবে বিবেচিত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে উঠে এসেছে জামায়াত, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এবং কয়েকটি ইসলামি দলের সমন্বয়ে গঠিত একটি নতুন নির্বাচনী জোট।

জনমত জরিপে ব্যবধান কমছে

সাম্প্রতিক জনমত জরিপগুলো জামায়াতের আত্মবিশ্বাস আরও দৃঢ় করেছে। গত ডিসেম্বর মাসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউট (আইআরআই)-এর জরিপে দেখা যায়, বিএনপির জনসমর্থন ৩৩ শতাংশ, আর জামায়াতের ২৯ শতাংশ।

এরপর গত সপ্তাহে প্রকাশিত বাংলাদেশের কয়েকটি সংস্থার যৌথ জরিপে ব্যবধান আরও কমে আসে। সেখানে বিএনপির সমর্থন দাঁড়ায় ৩৪ দশমিক ৭ শতাংশে, আর জামায়াতের সমর্থন ৩৩ দশমিক ৬ শতাংশে।

নাটকীয় প্রত্যাবর্তনের পথে?

বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াত যদি এবারের নির্বাচনে জয়ী হয়, তবে সেটি হবে দলটির জন্য এক চরম নাটকীয় প্রত্যাবর্তন। গত দেড় দশকে দলটি কঠোর দমন-পীড়নের শিকার হয়েছে। মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে দলটির শীর্ষ অনেক নেতার ফাঁসি কিংবা দীর্ঘ কারাদণ্ড হয়েছে।

১৯৪১ সালে সৈয়দ আবুল আলা মওদুদী কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত জামায়াত ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল—যা আজও দেশের একটি বড় অংশের মানুষের মনে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। তবে বর্তমান নেতৃত্বের দাবি, দীর্ঘদিনের নিপীড়ন তাদের প্রতি জনসমর্থন ও সহানুভূতি বাড়িয়েছে।

‘নতুন রাজনৈতিক শক্তি’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ

জামায়াতের নায়েবে আমির ড. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের আল-জাজিরাকে বলেন,

“বাংলাদেশের মানুষ ৫৫ বছর ধরে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির শাসন দেখেছে। এখন তারা একটি নতুন রাজনৈতিক শক্তিকে ক্ষমতায় দেখতে চায়।”

নিজেদের ‘মধ্যপন্থী ইসলামি শক্তি’ হিসেবে তুলে ধরতে জামায়াত এবারের নির্বাচনে নতুন কৌশল নিয়েছে। খুলনার মতো এলাকায় কৃষ্ণ নন্দী নামে একজন হিন্দু প্রার্থীকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে, যা সংখ্যালঘু ভোটারদের আকৃষ্ট করার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

উদ্বেগ ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া

তবে জামায়াতের সম্ভাব্য ক্ষমতায় আসা নিয়ে দেশি ও আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগও রয়েছে। অনেকের আশঙ্কা, ইসলামি দল ক্ষমতায় এলে শরিয়া আইন কার্যকর হতে পারে কিংবা নারী ও সংখ্যালঘুদের অধিকার সংকুচিত হতে পারে। যদিও জামায়াত নেতারা দাবি করছেন, তারা বিদ্যমান ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধানের মধ্যেই সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়ন করবেন।

আন্তর্জাতিক ক্রাইসিস গ্রুপের সিনিয়র কনসালটেন্ট থমাস কিনের মতে, জামায়াত ক্ষমতায় এলে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। বিশেষ করে ভারতের বিজেপি সরকারের সঙ্গে আদর্শিক দ্বন্দ্ব দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে প্রভাব ফেলতে পারে। অন্যদিকে, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক পুনর্গঠনের উদ্যোগ জামায়াতের জন্য ইতিবাচক হতে পারে।

সাংগঠনিক শক্তিতে আত্মবিশ্বাস

জামায়াতের সাংগঠনিক কাঠামো বর্তমানে বেশ সুসংহত বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। দলটির ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবির সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছে।

জামায়াত নেতাদের দাবি অনুযায়ী, দলটির প্রায় ২ কোটি সমর্থক এবং ২ লাখ ৫০ হাজার নিবন্ধিত ‘রুকন’ বা সদস্য রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এবারের নির্বাচন কেবল একটি ভোট নয়—বরং এটি হবে জামায়াতের জাতীয় গ্রহণযোগ্যতা অর্জনের একটি কঠিন পরীক্ষা।

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির ভোটই নির্ধারণ করবে, দীর্ঘদিন ধরে বিতর্কের কেন্দ্রে থাকা এই দলটি তাদের সাংগঠনিক ধৈর্য ও রাজনৈতিক সংগ্রামকে রাষ্ট্রীয় বৈধতায় রূপান্তর করতে পারবে কি না।

সূত্র: আল জাজিরা