ঢাকা ০৪:১১ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দুই স্ট্যাম্পে একই নম্বর, ভেন্ডারও নেই অস্তিত্ব!

  • ডেস্ক নিউজ
  • আপডেট : ০৩:১৬:১০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • 50

চাঁদপুরের হাজীগঞ্জে স্ট্যাম্প বিক্রির ঘটনায় উঠেছে গুরুতর প্রশ্ন। একই সিরিয়াল নম্বরের দুটি স্ট্যাম্প বিক্রির অভিযোগের পাশাপাশি স্ট্যাম্পে উল্লেখ করা ভেন্ডারের নাম ও লাইসেন্স নম্বরেরও সরকারি তালিকায় মিলছে না তথ্য। ফলে চেঙ্গারতলী বাজারের মুদি দোকানে বিক্রি হওয়া এসব স্ট্যাম্পের উৎস ও বৈধতা নিয়ে তৈরি হয়েছে রহস্য।

হাজীগঞ্জ উপজেলার দ্বাদশগ্রাম ইউনিয়নের চেঙ্গারতলী বাজারের ওই দোকানে প্রায় ২০ বছর ধরে স্ট্যাম্প বিক্রি করছেন শাহ আলম পাটোয়ারী। সম্প্রতি তার কাছ থেকে ১০০ টাকা মূল্যমানের তিনটি স্ট্যাম্প কেনেন স্থানীয় বাসিন্দা আলমগীর মিজি। পরে স্ট্যাম্পগুলো যাচাই করতে গিয়ে চোখে পড়ে অস্বাভাবিক বিষয়টি।

তিনটি স্ট্যাম্পের মধ্যে দুটি স্ট্যাম্পের সিরিয়াল নম্বর হুবহু একই—‘গ ট ৯১২৮৭০৫’। অপর স্ট্যাম্পটির নম্বর ‘গ ট ৯১২৮৭০৬’। একই মূল্যমানের দুটি পৃথক স্ট্যাম্পে একই সিরিয়াল নম্বর কীভাবে এলো, তা নিয়েই এখন প্রশ্ন।

শুধু সিরিয়াল নম্বরের অমিল নয়, স্ট্যাম্পের গায়ে উল্লেখ করা ভেন্ডারের পরিচয় নিয়েও তৈরি হয়েছে আরও বড় প্রশ্ন। স্ট্যাম্পে বিক্রেতা হিসেবে লেখা রয়েছে—‘মোঃ শামসুল আলম, স্ট্যাম্প ভেন্ডার, ফৌজদারি কোর্ট, চাঁদপুর’। এর সঙ্গে লাইসেন্স নম্বর হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে ‘১০৯৭৯৮’।

বিষয়টি যাচাই করতে ‘মোহাম্মদ শামসুল আলম’ নামে ওই স্ট্যাম্প ভেন্ডারের খোঁজ করা হয়। চাঁদপুরের সংশ্লিষ্ট এলাকায় খোঁজ নিয়েও তার অবস্থান কিংবা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সন্ধান পাওয়া যায়নি। স্থানীয় কয়েকজন স্ট্যাম্প ভেন্ডারও শামসুল আলম নামে এমন কোনো ব্যক্তিকে চেনেন না বলে জানিয়েছেন।

এরপর চাঁদপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সংশ্লিষ্ট আরএম শাখায় স্ট্যাম্প ভেন্ডারদের লাইসেন্সসংক্রান্ত তথ্য যাচাই করা হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, সেখানে ‘মোহাম্মদ শামসুল আলম’ নামে কোনো স্ট্যাম্প ভেন্ডারের লাইসেন্সের তথ্য পাওয়া যায়নি। এমনকি ২০২৬ সালে নবায়ন করা স্ট্যাম্প ভেন্ডারদের তালিকাতেও তার নাম নেই বলে জানা গেছে।

আরও গুরুতর বিষয় হলো, স্ট্যাম্পে উল্লেখ করা ‘১০৯৭৯৮’ নম্বরের কোনো লাইসেন্সের তথ্যও সংশ্লিষ্ট শাখায় পাওয়া যায়নি বলে সূত্রটি জানিয়েছে।

অর্থাৎ একটি স্ট্যাম্পে সরকারি ভেন্ডারের পরিচয় ও লাইসেন্স নম্বর থাকার কথা থাকলেও সেই পরিচয় এবং নম্বরের সরকারি রেকর্ড না মেলায় স্ট্যাম্পগুলোর উৎস নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে।

জেলা ট্রেজারি শাখার কর্মকর্তা সালাউদ্দিন জানান, ট্রেজারি থেকে স্ট্যাম্প ভেন্ডারদের কাছে স্ট্যাম্প সরবরাহের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়। একই সিরিয়াল নম্বরে দুটি স্ট্যাম্প থাকার কথা নয় বলেও জানান তিনি।

আইনের দিক থেকেও বিষয়টি হালকা নয়। সরকারি রাজস্ব স্ট্যাম্প জাল করা, জাল স্ট্যাম্প বিক্রি, জাল স্ট্যাম্প জেনেশুনে নিজের কাছে রাখা কিংবা আসল হিসেবে ব্যবহার—এসব বিষয়ে দণ্ডবিধির ২৫৫ থেকে ২৬০ ধারায় শাস্তির বিধান রয়েছে। বিশেষ করে জাল সরকারি স্ট্যাম্প জেনেশুনে বিক্রি বা বিক্রির প্রস্তাব দেওয়ার ক্ষেত্রে দণ্ডবিধির ২৫৮ ধারায় সর্বোচ্চ সাত বছর কারাদণ্ড ও জরিমানার বিধান রয়েছে।

তবে চেঙ্গারতলী বাজার থেকে পাওয়া স্ট্যাম্প দুটি আসল না জাল—এটি এখনো সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক পরীক্ষার বিষয়। একই সিরিয়াল নম্বরের দুটি স্ট্যাম্প এবং স্ট্যাম্পে উল্লেখ করা ভেন্ডারের লাইসেন্সের তথ্য না মেলার বিষয়টি তাই যথাযথ তদন্তের দাবি রাখে।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে স্ট্যাম্প বিক্রেতা শাহ আলম পাটোয়ারীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘আমি এই বিষয়ে পরে কথা বলব।’

হাজীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ইবনে আল জায়েদ হোসেন বলেন, ‘ডিসি অফিসের ট্রেজারি শাখা থেকে আমাদের কোনো মেসেজ দেওয়া হলে আমরা অবশ্যই অভিযান পরিচালনা করব।’

এখন প্রশ্ন হচ্ছে—একই সিরিয়াল নম্বরের দুটি স্ট্যাম্প বাজারে এলো কীভাবে? স্ট্যাম্পে ব্যবহৃত ‘শামসুল আলম’ নামের ভেন্ডার আদৌ বৈধ ভেন্ডার কি না? ‘১০৯৭৯৮’ লাইসেন্স নম্বরটি কার? আর চেঙ্গারতলীর দোকানে বিক্রি হওয়া স্ট্যাম্পগুলো ট্রেজারি থেকে বৈধ প্রক্রিয়ায় সরবরাহ করা হয়েছিল কি না?

এসব প্রশ্নের উত্তর মিলতে হলে স্ট্যাম্প দুটির উৎস, সরবরাহের চেইন, ভেন্ডারের লাইসেন্স এবং সংশ্লিষ্ট রেকর্ড যাচাই করে তদন্ত করা প্রয়োজন। তদন্তেই বেরিয়ে আসতে পারে—এটি নিছক মুদ্রণ বা সংরক্ষণজনিত কোনো ভুল, নাকি এর পেছনে রয়েছে আরও গুরুতর অনিয়ম।

ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ

দুই স্ট্যাম্পে একই নম্বর, ভেন্ডারও নেই অস্তিত্ব!

দুই স্ট্যাম্পে একই নম্বর, ভেন্ডারও নেই অস্তিত্ব!

আপডেট : ০৩:১৬:১০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

চাঁদপুরের হাজীগঞ্জে স্ট্যাম্প বিক্রির ঘটনায় উঠেছে গুরুতর প্রশ্ন। একই সিরিয়াল নম্বরের দুটি স্ট্যাম্প বিক্রির অভিযোগের পাশাপাশি স্ট্যাম্পে উল্লেখ করা ভেন্ডারের নাম ও লাইসেন্স নম্বরেরও সরকারি তালিকায় মিলছে না তথ্য। ফলে চেঙ্গারতলী বাজারের মুদি দোকানে বিক্রি হওয়া এসব স্ট্যাম্পের উৎস ও বৈধতা নিয়ে তৈরি হয়েছে রহস্য।

হাজীগঞ্জ উপজেলার দ্বাদশগ্রাম ইউনিয়নের চেঙ্গারতলী বাজারের ওই দোকানে প্রায় ২০ বছর ধরে স্ট্যাম্প বিক্রি করছেন শাহ আলম পাটোয়ারী। সম্প্রতি তার কাছ থেকে ১০০ টাকা মূল্যমানের তিনটি স্ট্যাম্প কেনেন স্থানীয় বাসিন্দা আলমগীর মিজি। পরে স্ট্যাম্পগুলো যাচাই করতে গিয়ে চোখে পড়ে অস্বাভাবিক বিষয়টি।

তিনটি স্ট্যাম্পের মধ্যে দুটি স্ট্যাম্পের সিরিয়াল নম্বর হুবহু একই—‘গ ট ৯১২৮৭০৫’। অপর স্ট্যাম্পটির নম্বর ‘গ ট ৯১২৮৭০৬’। একই মূল্যমানের দুটি পৃথক স্ট্যাম্পে একই সিরিয়াল নম্বর কীভাবে এলো, তা নিয়েই এখন প্রশ্ন।

শুধু সিরিয়াল নম্বরের অমিল নয়, স্ট্যাম্পের গায়ে উল্লেখ করা ভেন্ডারের পরিচয় নিয়েও তৈরি হয়েছে আরও বড় প্রশ্ন। স্ট্যাম্পে বিক্রেতা হিসেবে লেখা রয়েছে—‘মোঃ শামসুল আলম, স্ট্যাম্প ভেন্ডার, ফৌজদারি কোর্ট, চাঁদপুর’। এর সঙ্গে লাইসেন্স নম্বর হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে ‘১০৯৭৯৮’।

বিষয়টি যাচাই করতে ‘মোহাম্মদ শামসুল আলম’ নামে ওই স্ট্যাম্প ভেন্ডারের খোঁজ করা হয়। চাঁদপুরের সংশ্লিষ্ট এলাকায় খোঁজ নিয়েও তার অবস্থান কিংবা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সন্ধান পাওয়া যায়নি। স্থানীয় কয়েকজন স্ট্যাম্প ভেন্ডারও শামসুল আলম নামে এমন কোনো ব্যক্তিকে চেনেন না বলে জানিয়েছেন।

এরপর চাঁদপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সংশ্লিষ্ট আরএম শাখায় স্ট্যাম্প ভেন্ডারদের লাইসেন্সসংক্রান্ত তথ্য যাচাই করা হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, সেখানে ‘মোহাম্মদ শামসুল আলম’ নামে কোনো স্ট্যাম্প ভেন্ডারের লাইসেন্সের তথ্য পাওয়া যায়নি। এমনকি ২০২৬ সালে নবায়ন করা স্ট্যাম্প ভেন্ডারদের তালিকাতেও তার নাম নেই বলে জানা গেছে।

আরও গুরুতর বিষয় হলো, স্ট্যাম্পে উল্লেখ করা ‘১০৯৭৯৮’ নম্বরের কোনো লাইসেন্সের তথ্যও সংশ্লিষ্ট শাখায় পাওয়া যায়নি বলে সূত্রটি জানিয়েছে।

অর্থাৎ একটি স্ট্যাম্পে সরকারি ভেন্ডারের পরিচয় ও লাইসেন্স নম্বর থাকার কথা থাকলেও সেই পরিচয় এবং নম্বরের সরকারি রেকর্ড না মেলায় স্ট্যাম্পগুলোর উৎস নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে।

জেলা ট্রেজারি শাখার কর্মকর্তা সালাউদ্দিন জানান, ট্রেজারি থেকে স্ট্যাম্প ভেন্ডারদের কাছে স্ট্যাম্প সরবরাহের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়। একই সিরিয়াল নম্বরে দুটি স্ট্যাম্প থাকার কথা নয় বলেও জানান তিনি।

আইনের দিক থেকেও বিষয়টি হালকা নয়। সরকারি রাজস্ব স্ট্যাম্প জাল করা, জাল স্ট্যাম্প বিক্রি, জাল স্ট্যাম্প জেনেশুনে নিজের কাছে রাখা কিংবা আসল হিসেবে ব্যবহার—এসব বিষয়ে দণ্ডবিধির ২৫৫ থেকে ২৬০ ধারায় শাস্তির বিধান রয়েছে। বিশেষ করে জাল সরকারি স্ট্যাম্প জেনেশুনে বিক্রি বা বিক্রির প্রস্তাব দেওয়ার ক্ষেত্রে দণ্ডবিধির ২৫৮ ধারায় সর্বোচ্চ সাত বছর কারাদণ্ড ও জরিমানার বিধান রয়েছে।

তবে চেঙ্গারতলী বাজার থেকে পাওয়া স্ট্যাম্প দুটি আসল না জাল—এটি এখনো সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক পরীক্ষার বিষয়। একই সিরিয়াল নম্বরের দুটি স্ট্যাম্প এবং স্ট্যাম্পে উল্লেখ করা ভেন্ডারের লাইসেন্সের তথ্য না মেলার বিষয়টি তাই যথাযথ তদন্তের দাবি রাখে।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে স্ট্যাম্প বিক্রেতা শাহ আলম পাটোয়ারীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘আমি এই বিষয়ে পরে কথা বলব।’

হাজীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ইবনে আল জায়েদ হোসেন বলেন, ‘ডিসি অফিসের ট্রেজারি শাখা থেকে আমাদের কোনো মেসেজ দেওয়া হলে আমরা অবশ্যই অভিযান পরিচালনা করব।’

এখন প্রশ্ন হচ্ছে—একই সিরিয়াল নম্বরের দুটি স্ট্যাম্প বাজারে এলো কীভাবে? স্ট্যাম্পে ব্যবহৃত ‘শামসুল আলম’ নামের ভেন্ডার আদৌ বৈধ ভেন্ডার কি না? ‘১০৯৭৯৮’ লাইসেন্স নম্বরটি কার? আর চেঙ্গারতলীর দোকানে বিক্রি হওয়া স্ট্যাম্পগুলো ট্রেজারি থেকে বৈধ প্রক্রিয়ায় সরবরাহ করা হয়েছিল কি না?

এসব প্রশ্নের উত্তর মিলতে হলে স্ট্যাম্প দুটির উৎস, সরবরাহের চেইন, ভেন্ডারের লাইসেন্স এবং সংশ্লিষ্ট রেকর্ড যাচাই করে তদন্ত করা প্রয়োজন। তদন্তেই বেরিয়ে আসতে পারে—এটি নিছক মুদ্রণ বা সংরক্ষণজনিত কোনো ভুল, নাকি এর পেছনে রয়েছে আরও গুরুতর অনিয়ম।