ঢাকা ০৯:৪৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৪ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সৌদি আরবে মতলবের প্রবাসী জসিম উদ্দিনকে হ’ত্যার অভিযোগ, মরুভূমিতে মিলল মরদেহ

  • ডেস্ক নিউজ
  • আপডেট : ০৯:০৪:৩৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • 5

সৌদি আরবে চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার প্রবাসী মোঃ জসিম উদ্দিনকে হত্যার অভিযোগ উঠেছে তাঁরই এক সহকর্মীর বিরুদ্ধে। দেশটির আল কাসিম এলাকার একটি মরুভূমি থেকে বালুচাপা অবস্থায় তাঁর মরদেহ উদ্ধারের খবর পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় জসিমের পরিবারের অভিযোগ, তাঁর সঙ্গে থাকা বড় সাব্বির নামে পরিচিত এক ব্যক্তি টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে তাঁকে হত্যা করেছেন। পরে ঘটনাটি আড়াল করতে অপহরণের নাটক সাজিয়ে পরিবারের কাছে টাকা দাবি করেন তিনি।
নিহত মোঃ জসিম উদ্দিন চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার ঘাশিরচর গ্রামের আয়্যুব আলীর ছেলে। তিনি দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরবে প্রবাসী ছিলেন। তাঁর স্ত্রী রুমা আক্তার ও তিন কন্যাসন্তান রয়েছে।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতা ফেরাতে ২০০৪ সালে বৈধভাবে সৌদি আরবে পাড়ি জমান জসিম উদ্দিন। ২০০৭ সালের ১৫ অক্টোবর মতলবের গজরা এলাকার মিয়াবাড়ির আবুল কাশেমের মেয়ে রুমা আক্তারের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন তিনি। বিয়ের পর আবারও সৌদি আরবে ফিরে কর্মজীবন শুরু করেন। প্রবাসে ব্যবসা-বাণিজ্য করতে গিয়ে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর আকামা নবায়ন করতে পারেননি তিনি। পরিবারের দাবি, ২০২৩ সাল থেকে তিনি অবৈধভাবে সৌদি আরবে অবস্থান করছিলেন।
সর্বশেষ তিনি সৌদি আরবের আল কাসিম এলাকার আল গাম্মাস নামের একটি মাজরায় (কৃষি খামার) শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন। সেখানে প্রায় ২৫ জন শ্রমিক কাজ করতেন। জসিম উদ্দিন যে কক্ষে থাকতেন, সেখানে আরও দুই বাংলাদেশি ছিলেন। তাঁদের একজন মতলব দক্ষিণ উপজেলার দিগলদী গ্রামের তমিজ উদ্দিন বকাউলের ছেলে জাকির বকাউল, যিনি ছোট সাব্বির নামে পরিচিত।
পরিবারের অভিযোগ, গত ১৯ সেপ্টেম্বর শনিবার বাংলাদেশ সময় রাত ৮টার দিকে পরিবারের কাছে প্রায় চার লাখ টাকা পাঠানোর উদ্দেশ্যে বড় সাব্বিরকে সঙ্গে নিয়ে বাসা থেকে বের হন জসিম উদ্দিন। এ সময় তাঁর কাছে টাকা ছিল। কিছু দূর যাওয়ার পর বড় সাব্বির টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। একপর্যায়ে তাঁদের মধ্যে ধস্তাধস্তি হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, তখন পেছন থেকে লাঠি দিয়ে জসিমের মাথা বা শরীরের পেছনের অংশে আঘাত করা হয়। এতে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন এবং পরে মারা যান।
পরিবারের দাবি, জসিমের মৃত্যুর পর তাঁর মরদেহ পাশের একটি মরুভূমিতে বালুচাপা দিয়ে রাখা হয়। এ সময় তাঁর ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটিও নিয়ে যান অভিযুক্ত ব্যক্তি। পরে কক্ষে ফিরে জসিমের অবস্থান সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি কিছু জানেন না বলে জানান।
নিহতের স্বজনদের অভিযোগ, জসিম নিখোঁজ হওয়ার পর তাঁর মোবাইল ফোন ব্যবহার করে অপহরণের নাটক সাজানো হয়। তাঁর স্ত্রী ও আত্মীয়স্বজনের কাছে প্রায় দেড় লাখ টাকা দাবি করা হয়। টাকা না দিলে জসিমকে হত্যা করা হবে বলেও হুমকি দেওয়া হয়। সর্বশেষ ২৩ সেপ্টেম্বর রাতে জসিমের স্ত্রীর কাছে খুদেবার্তার মাধ্যমে আরও এক লাখ টাকা দাবি করা হয় বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
পরে ২৫ সেপ্টেম্বর শুক্রবার বেলা ১১টার দিকে নওগাঁর আশরাফুল নামে এক ব্যক্তি ফোন করে জসিমের স্ত্রীকে তাঁর মৃত্যুর খবর জানান। এরপর রুমা আক্তার সৌদি আরবে থাকা ছোট সাব্বিরের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, ছোট সাব্বির তাঁকে জানান, বড় সাব্বির জসিমকে হত্যা করে পাশের একটি মাজরায় বালুর নিচে চাপা দিয়ে রেখেছিলেন।
ছোট সাব্বিরের ভাষ্য অনুযায়ী, কয়েকজন বাংলাদেশি শ্রমিক পাশের মাজরায় কাজ করতে যাওয়ার পথে বালুর ওপর মরদেহের অংশবিশেষ দেখতে পান। পরে পুলিশকে খবর দেওয়া হলে পুলিশ ঘটনাস্থলে আসে। এ সময় তিনি আরও কয়েকজনের সঙ্গে মরদেহটি বালুর নিচ থেকে তুলতে সহায়তা করেন। পরে পুলিশ তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিয়ে যায়। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তাঁকে বাসায় যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয় বলে তিনি দাবি করেন।
ছোট সাব্বিরের অভিযোগ, বড় সাব্বির তাঁদের সঙ্গে প্রায়ই ঝগড়া করতেন এবং জোরপূর্বক টাকা ধার নিতেন। সৌদি আরবে অবৈধ অবস্থানের কারণে তাঁরা প্রতিবাদ করতে সাহস পেতেন না। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে বড় সাব্বির তাঁদের ওপর প্রভাব বিস্তার করতেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
এদিকে পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে স্ত্রী ও তিন কন্যাসন্তান চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন। স্বজনেরা জসিম উদ্দিনের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনা এবং ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের বিচারের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন। এবং মতলব উত্তর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন।
তবে এ ঘটনায় সৌদি আরবের পুলিশের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন, হত্যাকাণ্ডের সুনির্দিষ্ট কারণ এবং অভিযুক্ত ব্যক্তির গ্রেপ্তারের বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তী প্রতিবেদনে তুলে ধরা হবে।

ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ

সৌদি আরবে মতলবের প্রবাসী জসিম উদ্দিনকে হ’ত্যার অভিযোগ, মরুভূমিতে মিলল মরদেহ

সৌদি আরবে মতলবের প্রবাসী জসিম উদ্দিনকে হ’ত্যার অভিযোগ, মরুভূমিতে মিলল মরদেহ

আপডেট : ০৯:০৪:৩৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সৌদি আরবে চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার প্রবাসী মোঃ জসিম উদ্দিনকে হত্যার অভিযোগ উঠেছে তাঁরই এক সহকর্মীর বিরুদ্ধে। দেশটির আল কাসিম এলাকার একটি মরুভূমি থেকে বালুচাপা অবস্থায় তাঁর মরদেহ উদ্ধারের খবর পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় জসিমের পরিবারের অভিযোগ, তাঁর সঙ্গে থাকা বড় সাব্বির নামে পরিচিত এক ব্যক্তি টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে তাঁকে হত্যা করেছেন। পরে ঘটনাটি আড়াল করতে অপহরণের নাটক সাজিয়ে পরিবারের কাছে টাকা দাবি করেন তিনি।
নিহত মোঃ জসিম উদ্দিন চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার ঘাশিরচর গ্রামের আয়্যুব আলীর ছেলে। তিনি দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরবে প্রবাসী ছিলেন। তাঁর স্ত্রী রুমা আক্তার ও তিন কন্যাসন্তান রয়েছে।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতা ফেরাতে ২০০৪ সালে বৈধভাবে সৌদি আরবে পাড়ি জমান জসিম উদ্দিন। ২০০৭ সালের ১৫ অক্টোবর মতলবের গজরা এলাকার মিয়াবাড়ির আবুল কাশেমের মেয়ে রুমা আক্তারের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন তিনি। বিয়ের পর আবারও সৌদি আরবে ফিরে কর্মজীবন শুরু করেন। প্রবাসে ব্যবসা-বাণিজ্য করতে গিয়ে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর আকামা নবায়ন করতে পারেননি তিনি। পরিবারের দাবি, ২০২৩ সাল থেকে তিনি অবৈধভাবে সৌদি আরবে অবস্থান করছিলেন।
সর্বশেষ তিনি সৌদি আরবের আল কাসিম এলাকার আল গাম্মাস নামের একটি মাজরায় (কৃষি খামার) শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন। সেখানে প্রায় ২৫ জন শ্রমিক কাজ করতেন। জসিম উদ্দিন যে কক্ষে থাকতেন, সেখানে আরও দুই বাংলাদেশি ছিলেন। তাঁদের একজন মতলব দক্ষিণ উপজেলার দিগলদী গ্রামের তমিজ উদ্দিন বকাউলের ছেলে জাকির বকাউল, যিনি ছোট সাব্বির নামে পরিচিত।
পরিবারের অভিযোগ, গত ১৯ সেপ্টেম্বর শনিবার বাংলাদেশ সময় রাত ৮টার দিকে পরিবারের কাছে প্রায় চার লাখ টাকা পাঠানোর উদ্দেশ্যে বড় সাব্বিরকে সঙ্গে নিয়ে বাসা থেকে বের হন জসিম উদ্দিন। এ সময় তাঁর কাছে টাকা ছিল। কিছু দূর যাওয়ার পর বড় সাব্বির টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। একপর্যায়ে তাঁদের মধ্যে ধস্তাধস্তি হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, তখন পেছন থেকে লাঠি দিয়ে জসিমের মাথা বা শরীরের পেছনের অংশে আঘাত করা হয়। এতে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন এবং পরে মারা যান।
পরিবারের দাবি, জসিমের মৃত্যুর পর তাঁর মরদেহ পাশের একটি মরুভূমিতে বালুচাপা দিয়ে রাখা হয়। এ সময় তাঁর ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটিও নিয়ে যান অভিযুক্ত ব্যক্তি। পরে কক্ষে ফিরে জসিমের অবস্থান সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি কিছু জানেন না বলে জানান।
নিহতের স্বজনদের অভিযোগ, জসিম নিখোঁজ হওয়ার পর তাঁর মোবাইল ফোন ব্যবহার করে অপহরণের নাটক সাজানো হয়। তাঁর স্ত্রী ও আত্মীয়স্বজনের কাছে প্রায় দেড় লাখ টাকা দাবি করা হয়। টাকা না দিলে জসিমকে হত্যা করা হবে বলেও হুমকি দেওয়া হয়। সর্বশেষ ২৩ সেপ্টেম্বর রাতে জসিমের স্ত্রীর কাছে খুদেবার্তার মাধ্যমে আরও এক লাখ টাকা দাবি করা হয় বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
পরে ২৫ সেপ্টেম্বর শুক্রবার বেলা ১১টার দিকে নওগাঁর আশরাফুল নামে এক ব্যক্তি ফোন করে জসিমের স্ত্রীকে তাঁর মৃত্যুর খবর জানান। এরপর রুমা আক্তার সৌদি আরবে থাকা ছোট সাব্বিরের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, ছোট সাব্বির তাঁকে জানান, বড় সাব্বির জসিমকে হত্যা করে পাশের একটি মাজরায় বালুর নিচে চাপা দিয়ে রেখেছিলেন।
ছোট সাব্বিরের ভাষ্য অনুযায়ী, কয়েকজন বাংলাদেশি শ্রমিক পাশের মাজরায় কাজ করতে যাওয়ার পথে বালুর ওপর মরদেহের অংশবিশেষ দেখতে পান। পরে পুলিশকে খবর দেওয়া হলে পুলিশ ঘটনাস্থলে আসে। এ সময় তিনি আরও কয়েকজনের সঙ্গে মরদেহটি বালুর নিচ থেকে তুলতে সহায়তা করেন। পরে পুলিশ তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিয়ে যায়। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তাঁকে বাসায় যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয় বলে তিনি দাবি করেন।
ছোট সাব্বিরের অভিযোগ, বড় সাব্বির তাঁদের সঙ্গে প্রায়ই ঝগড়া করতেন এবং জোরপূর্বক টাকা ধার নিতেন। সৌদি আরবে অবৈধ অবস্থানের কারণে তাঁরা প্রতিবাদ করতে সাহস পেতেন না। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে বড় সাব্বির তাঁদের ওপর প্রভাব বিস্তার করতেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
এদিকে পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে স্ত্রী ও তিন কন্যাসন্তান চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন। স্বজনেরা জসিম উদ্দিনের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনা এবং ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের বিচারের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন। এবং মতলব উত্তর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন।
তবে এ ঘটনায় সৌদি আরবের পুলিশের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন, হত্যাকাণ্ডের সুনির্দিষ্ট কারণ এবং অভিযুক্ত ব্যক্তির গ্রেপ্তারের বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তী প্রতিবেদনে তুলে ধরা হবে।