ঢাকা ০৭:২৩ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৫ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মতলব উত্তরে ফ্যাসিস্ট আমলে কিনা বায়োমেট্রিক মেশিন অকেজো, কোটি টাকা অপচয়

  • সুমন আহমেদ
  • আপডেট : ০৬:৫৯:১৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ২২ এপ্রিল ২০২৬
  • 86

শিক্ষকদের নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করতে মতলব উত্তর উপজেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় গুলোতে স্থাপন করা হয়েছিলো  বায়োমেট্রিক হাজিরা মেশিন। বায়োমেট্রিক হাজিরা মেশিন গুলো এখন কার্যত অচল। প্রায় আট বছর আগে বসানো এসব মেশিনে ব্যয় হয়েছে কোটি টাকা। অথচ শিক্ষার মান উন্নয়নে এসব মেশিন কোনো কাজে আসেনি বলে অভিযোগ উঠেছে।

মতলব উত্তরে ১৮০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে এসব বায়োমেট্রিক মেশিন স্থাপন করা হয়। প্রতিটি বায়োমেট্রিক
মেশিনের জন্য বিদ্যালয় ফান্ড থেকে পরিশোধ করা হয়েছে ২৬ থেকে ৩৫ হাজার টাকা। তবে বাজারে একই ধরনের মেশিনের মূল্য ছিল মাত্র পাঁচ থেকে ছয় হাজার টাকা।

অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক প্রভাব ও তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের চাপেই অতিরিক্ত দামে এসব নিম্নমানের মেশিন সরবরাহ করা হয়েছিল।

সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, বেশির ভাগ বিদ্যালয়ে মেশিনগুলো এখন আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। কোথাও আবার প্রধান শিক্ষকের কক্ষে দেয়ালে ঝুলে রয়েছে। তবে এ গুলোর  কোনো সংযোগ নেই। যেসব বিদ্যালয়ে ডাটাবেজ সংযোগ ছিল, সেখানেও মেশিনগুলো দীর্ঘ দিন ধরে অচল।

শিক্ষকেরা অভিযোগ করেন, শুরুতে কিছুদিন মেশিন গুলো চালু থাকলেও নিম্নমানের হওয়ায় দ্রুত নষ্ট হয়ে গেছে । পরে আর মেরামতের উদ্যোগ নেয়া হয়নি। এরই মধ্যে ওয়ারেন্টির মেয়াদও শেষ হয়ে গেছে।

এ বিষয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে। তারা বলেন, সরকারি টাকায় কেনা জিনিস যদি জনগণের কাজে না লাগে, তাহলে এর দায় কে নেবে? শুধু কেনার মধ্যেই দায়িত্ব শেষ হয়ে গেলে চলবে না।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বেশ কয়েকজন প্রধান শিক্ষক জানান, মেশিন ক্রয় প্রক্রিয়ায় একটি সিন্ডিকেট সক্রিয় ছিল। তাদের মাধ্যমে নিম্নমানের যন্ত্রপাতি উচ্চমূল্যে সরবরাহ করা হয়।যাতে  ব্যক্তিগত লাভবান হওয়াই ছিল মূল উদ্দেশ্য।

অভিযোগ রয়েছে, এ সিন্ডিকেটের পেছনে স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী আওয়ামী’লীগ নেতার আশীর্বাদ ছিল।

৯২ নং গজরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক (ভারপ্রাপ্ত) শাহ আলম বলেন, “সরকারি অর্থ ব্যয়ে বায়োমেট্রিক মেশিনটি আমাদের বিদ্যালয়ে স্থাপন করা
হয়েছিল। কিন্তু  প্রয়োজনীয় সংযোগ না থাকায় এটি শুরু থেকেই অচল রয়েছে। ফলে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয়ের পরও এর কোনো বাস্তব সুফল আমরা পাচ্ছি না। বাস্তবতা যাচাই ছাড়াই এমন প্রকল্প বাস্তবায়ন করায় এটি কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে। দীর্ঘদিন ধরে মেশিনটি ব্যবহারহীন অবস্থায় পড়ে থাকলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর নজরদারি বা উদ্যোগ চোখে পড়েনি।

১০ নং ওটারচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আশিকুজ্জামান বলেন, “সরকারি অর্থ ব্যয়ে স্থাপিত বায়োমেট্রিক মেশিনটি শুরু থেকেই অকার্যকর। প্রয়োজনীয় সংযোগ ও কারিগরি সুবিধা ছাড়াই এটি বসানো হয়েছে। যা সম্পূর্ণ পরিকল্পনাহীনতার পরিচয়। ফলে এত টাকা খরচ করেও প্রতিষ্ঠান কোনো ধরনের সুফল পাচ্ছে না। দীর্ঘদিন ধরে মেশিনটি অকেজো অবস্থায় পড়ে থাকলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো নজরদারি বা জবাবদিহিতা নেই। বিষয়টি একাধিকবার জানানো হলেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। আমাদের কাছে এটি সরাসরি সরকারি অর্থের অপচয় বলেই মনে হচ্ছে। দ্রুত তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে এমন অনিয়ম আরও বাড়বে।”

মতলব উত্তর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা  মো. হারুনুর রশিদ মোল্লা বলেন, প্রকল্পটি তার যোগদানের আগের হলেও বাস্তবতা হলো কোনো বিদ্যালয়েই এখন বায়োমেট্রিক হাজিরা মেশিন সচল নেই।

ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ

হাজীগঞ্জের বাকিলা খলাপাড়ায় ৬৫ বছরের বৃদ্ধ নিখোঁজ, উদ্বেগে স্বজনরা

মতলব উত্তরে ফ্যাসিস্ট আমলে কিনা বায়োমেট্রিক মেশিন অকেজো, কোটি টাকা অপচয়

আপডেট : ০৬:৫৯:১৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ২২ এপ্রিল ২০২৬

শিক্ষকদের নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করতে মতলব উত্তর উপজেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় গুলোতে স্থাপন করা হয়েছিলো  বায়োমেট্রিক হাজিরা মেশিন। বায়োমেট্রিক হাজিরা মেশিন গুলো এখন কার্যত অচল। প্রায় আট বছর আগে বসানো এসব মেশিনে ব্যয় হয়েছে কোটি টাকা। অথচ শিক্ষার মান উন্নয়নে এসব মেশিন কোনো কাজে আসেনি বলে অভিযোগ উঠেছে।

মতলব উত্তরে ১৮০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে এসব বায়োমেট্রিক মেশিন স্থাপন করা হয়। প্রতিটি বায়োমেট্রিক
মেশিনের জন্য বিদ্যালয় ফান্ড থেকে পরিশোধ করা হয়েছে ২৬ থেকে ৩৫ হাজার টাকা। তবে বাজারে একই ধরনের মেশিনের মূল্য ছিল মাত্র পাঁচ থেকে ছয় হাজার টাকা।

অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক প্রভাব ও তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের চাপেই অতিরিক্ত দামে এসব নিম্নমানের মেশিন সরবরাহ করা হয়েছিল।

সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, বেশির ভাগ বিদ্যালয়ে মেশিনগুলো এখন আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। কোথাও আবার প্রধান শিক্ষকের কক্ষে দেয়ালে ঝুলে রয়েছে। তবে এ গুলোর  কোনো সংযোগ নেই। যেসব বিদ্যালয়ে ডাটাবেজ সংযোগ ছিল, সেখানেও মেশিনগুলো দীর্ঘ দিন ধরে অচল।

শিক্ষকেরা অভিযোগ করেন, শুরুতে কিছুদিন মেশিন গুলো চালু থাকলেও নিম্নমানের হওয়ায় দ্রুত নষ্ট হয়ে গেছে । পরে আর মেরামতের উদ্যোগ নেয়া হয়নি। এরই মধ্যে ওয়ারেন্টির মেয়াদও শেষ হয়ে গেছে।

এ বিষয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে। তারা বলেন, সরকারি টাকায় কেনা জিনিস যদি জনগণের কাজে না লাগে, তাহলে এর দায় কে নেবে? শুধু কেনার মধ্যেই দায়িত্ব শেষ হয়ে গেলে চলবে না।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বেশ কয়েকজন প্রধান শিক্ষক জানান, মেশিন ক্রয় প্রক্রিয়ায় একটি সিন্ডিকেট সক্রিয় ছিল। তাদের মাধ্যমে নিম্নমানের যন্ত্রপাতি উচ্চমূল্যে সরবরাহ করা হয়।যাতে  ব্যক্তিগত লাভবান হওয়াই ছিল মূল উদ্দেশ্য।

অভিযোগ রয়েছে, এ সিন্ডিকেটের পেছনে স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী আওয়ামী’লীগ নেতার আশীর্বাদ ছিল।

৯২ নং গজরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক (ভারপ্রাপ্ত) শাহ আলম বলেন, “সরকারি অর্থ ব্যয়ে বায়োমেট্রিক মেশিনটি আমাদের বিদ্যালয়ে স্থাপন করা
হয়েছিল। কিন্তু  প্রয়োজনীয় সংযোগ না থাকায় এটি শুরু থেকেই অচল রয়েছে। ফলে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয়ের পরও এর কোনো বাস্তব সুফল আমরা পাচ্ছি না। বাস্তবতা যাচাই ছাড়াই এমন প্রকল্প বাস্তবায়ন করায় এটি কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে। দীর্ঘদিন ধরে মেশিনটি ব্যবহারহীন অবস্থায় পড়ে থাকলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর নজরদারি বা উদ্যোগ চোখে পড়েনি।

১০ নং ওটারচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আশিকুজ্জামান বলেন, “সরকারি অর্থ ব্যয়ে স্থাপিত বায়োমেট্রিক মেশিনটি শুরু থেকেই অকার্যকর। প্রয়োজনীয় সংযোগ ও কারিগরি সুবিধা ছাড়াই এটি বসানো হয়েছে। যা সম্পূর্ণ পরিকল্পনাহীনতার পরিচয়। ফলে এত টাকা খরচ করেও প্রতিষ্ঠান কোনো ধরনের সুফল পাচ্ছে না। দীর্ঘদিন ধরে মেশিনটি অকেজো অবস্থায় পড়ে থাকলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো নজরদারি বা জবাবদিহিতা নেই। বিষয়টি একাধিকবার জানানো হলেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। আমাদের কাছে এটি সরাসরি সরকারি অর্থের অপচয় বলেই মনে হচ্ছে। দ্রুত তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে এমন অনিয়ম আরও বাড়বে।”

মতলব উত্তর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা  মো. হারুনুর রশিদ মোল্লা বলেন, প্রকল্পটি তার যোগদানের আগের হলেও বাস্তবতা হলো কোনো বিদ্যালয়েই এখন বায়োমেট্রিক হাজিরা মেশিন সচল নেই।