ঢাকা ১২:৫৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ১০ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ফরিদগঞ্জে এক জমির নামজারি নিয়ে এসিল্যান্ডের ৩ সিদ্ধান্ত: রিভিশন মামলা চলাকালে নতুন খারিজের অনুমোদন

  • রিয়াজ শাওন
  • আপডেট : ১০:১৩:৩২ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬
  • 63

চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জে একই জমি নিয়ে তিন দফায় তিন ধরনের সিদ্ধান্ত দিয়েছেন তৎকালীন উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) এ. আর. এম. জাহিদ হোসেন। প্রথমে রোকেয়া বেগমের নামে নামজারি অনুমোদন, পরে আপত্তির শুনানি নিয়ে তা বাতিল—এরপর সেই বাতিল আদেশের বিরুদ্ধে রিভিশন মামলা চলমান থাকতেই একই জমি প্রতিপক্ষ জামাল খানের নামে নতুন করে নামজারি অনুমোদন। আরও তাৎপর্যপূর্ণ হলো, রাজস্ব আদালত সংশ্লিষ্ট নোটিশ ও নথি তলবের মাত্র দুই দিন পরই দেওয়া হয় নতুন নামজারির অনুমোদন। ধারাবাহিক এসব সিদ্ধান্তে প্রশ্ন উঠেছে, একই জমি নিয়ে বারবার সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের প্রশাসনিক ও আইনগত ভিত্তি কী ছিল?

সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, বিরোধপূর্ণ জমিতে প্রথমে রোকেয়া বেগমের নামে নামজারি অনুমোদন দেওয়া হয় তৎকালীন এসিল্যান্ড জাহিদ হোসেনের দপ্তর থেকে। পরবর্তী সময়ে প্রতিপক্ষ জামাল খান ওই নামজারির বিরুদ্ধে আপত্তি জানান। এরপর উভয় পক্ষের শুনানি শেষে রোকেয়া বেগমের নামে দেওয়া আগের নামজারি বাতিল করেন জাহিদ হোসেন।

ওই বাতিল আদেশের বিরুদ্ধে রোকেয়া বেগমের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) আদালতে রিভিশন মামলা দায়ের করা হয়। ২০২৬ সালের ১ জুন দায়ের করা মামলাটির নম্বর ১৯/২০২৬। অর্থাৎ, আগের নামজারি বাতিলের সিদ্ধান্তটি তখন রাজস্ব আদালতে চ্যালেঞ্জের মুখে ছিল।

মামলার নথি অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১১ আগস্ট আদালত সংশ্লিষ্ট নোটিশ ও নথি তলব করেন। এর মাত্র দুই দিন পর, ১৩ আগস্ট একই জমিতে জামাল খানের নামে নতুন নামজারি অনুমোদন দেওয়া হয়। নতুন নামজারি মামলার নম্বর ২০৩২ এবং খতিয়ান নম্বর ২০২৬-১০০০১৬। জমিটি ফরিদগঞ্জ উপজেলার ইছাপুরা মৌজার ৯৫ নম্বর জেএলভুক্ত ৬৬০ ও ৬৬২ দাগে অবস্থিত। এর মোট পরিমাণ ১০ শতাংশ। রিভিশন মামলার পরবর্তী শুনানির তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে ৯ নভেম্বর ২০২৬।

রোকেয়া বেগমের পক্ষের অভিযোগ, জামাল খানের নামে নতুন নামজারি অনুমোদনের আগে তাঁদের যথাযথ নোটিশ দেওয়া হয়নি। নোটিশ দেওয়া হলে তাঁরা আপত্তি জানিয়ে নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরার সুযোগ পেতেন বলে দাবি তাঁদের।

একই জমিতে প্রথমে নামজারি অনুমোদন, পরে তা বাতিল এবং এরপর প্রতিপক্ষের নামে নতুন করে নামজারি অনুমোদনের প্রতিটি সিদ্ধান্তের পেছনে কী যুক্তি ও নথি ছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। রিভিশন মামলা চলমান থাকার বিষয়টি নতুন নামজারির ক্ষেত্রে কীভাবে বিবেচনা করা হয়েছিল, সংশ্লিষ্ট পক্ষকে নোটিশ দেওয়া ও শুনানির সুযোগ রাখা হয়েছিল কি না এবং নতুন অনুমোদনের ভিত্তি কী ছিল—এসব বিষয় সংশ্লিষ্ট নথি পর্যালোচনার মাধ্যমে স্পষ্ট হতে পারে।

এদিকে, বিষয়টি নিয়ে সাবেক কয়েকজন উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও তহশিলদারের সঙ্গে কথা হলে তাঁরা জানান, বিরোধপূর্ণ জমির চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত সাধারণত তাঁরা ওই জমির নামজারি অনুমোদন দেওয়া থেকে বিরত থাকেন। তাঁদের ভাষ্য, এ ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট আইনি বাধ্যবাধকতা থাকুক বা না থাকুক, এমন পরিস্থিতিতে নামজারি অনুমোদন না দেওয়াটা তাঁদের প্রশাসনিক চর্চার অংশ।

চাঁদপুর ল’ কলেজের শিক্ষক ও আইনজীবী শেখ সাদী বলেন, “সাধারণত উচ্চ আদালতে কোনো মামলা চলমান থাকলে নিম্ন আদালতে ওই বিষয়ে কার্যক্রম বন্ধ থাকে—এটাই আমরা জানি।”

এ বিষয়ে ফরিদগঞ্জ উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) আনিসুর রহমান বলেন, “মামলা চলমান থাকলেই নতুন খারিজের অনুমোদন দেওয়া যাবে না—এমন কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা নেই। তবে সাধারণত এ ধরনের বিষয় আমরা হোল্ডে রাখি বা এড়িয়ে চলি।”

তৎকালীন উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) এ. আর. এম. জাহিদ হোসেন বদলি হয়ে যাওয়ায় এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

বিষয়টি সম্পর্কে চাঁদপুরের জেলা প্রশাসক আহমেদ জিয়াউর রহমান বলেন, “এমনটা হওয়ার কথা না। তবে আসলে কী হয়েছে, আমাকে ডকুমেন্টগুলো দেন। আমি দেখে আপনাকে জানাব।”

ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ

ফরিদগঞ্জে এক জমির নামজারি নিয়ে এসিল্যান্ডের ৩ সিদ্ধান্ত: রিভিশন মামলা চলাকালে নতুন খারিজের অনুমোদন

ফরিদগঞ্জে এক জমির নামজারি নিয়ে এসিল্যান্ডের ৩ সিদ্ধান্ত: রিভিশন মামলা চলাকালে নতুন খারিজের অনুমোদন

আপডেট : ১০:১৩:৩২ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬

চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জে একই জমি নিয়ে তিন দফায় তিন ধরনের সিদ্ধান্ত দিয়েছেন তৎকালীন উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) এ. আর. এম. জাহিদ হোসেন। প্রথমে রোকেয়া বেগমের নামে নামজারি অনুমোদন, পরে আপত্তির শুনানি নিয়ে তা বাতিল—এরপর সেই বাতিল আদেশের বিরুদ্ধে রিভিশন মামলা চলমান থাকতেই একই জমি প্রতিপক্ষ জামাল খানের নামে নতুন করে নামজারি অনুমোদন। আরও তাৎপর্যপূর্ণ হলো, রাজস্ব আদালত সংশ্লিষ্ট নোটিশ ও নথি তলবের মাত্র দুই দিন পরই দেওয়া হয় নতুন নামজারির অনুমোদন। ধারাবাহিক এসব সিদ্ধান্তে প্রশ্ন উঠেছে, একই জমি নিয়ে বারবার সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের প্রশাসনিক ও আইনগত ভিত্তি কী ছিল?

সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, বিরোধপূর্ণ জমিতে প্রথমে রোকেয়া বেগমের নামে নামজারি অনুমোদন দেওয়া হয় তৎকালীন এসিল্যান্ড জাহিদ হোসেনের দপ্তর থেকে। পরবর্তী সময়ে প্রতিপক্ষ জামাল খান ওই নামজারির বিরুদ্ধে আপত্তি জানান। এরপর উভয় পক্ষের শুনানি শেষে রোকেয়া বেগমের নামে দেওয়া আগের নামজারি বাতিল করেন জাহিদ হোসেন।

ওই বাতিল আদেশের বিরুদ্ধে রোকেয়া বেগমের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) আদালতে রিভিশন মামলা দায়ের করা হয়। ২০২৬ সালের ১ জুন দায়ের করা মামলাটির নম্বর ১৯/২০২৬। অর্থাৎ, আগের নামজারি বাতিলের সিদ্ধান্তটি তখন রাজস্ব আদালতে চ্যালেঞ্জের মুখে ছিল।

মামলার নথি অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১১ আগস্ট আদালত সংশ্লিষ্ট নোটিশ ও নথি তলব করেন। এর মাত্র দুই দিন পর, ১৩ আগস্ট একই জমিতে জামাল খানের নামে নতুন নামজারি অনুমোদন দেওয়া হয়। নতুন নামজারি মামলার নম্বর ২০৩২ এবং খতিয়ান নম্বর ২০২৬-১০০০১৬। জমিটি ফরিদগঞ্জ উপজেলার ইছাপুরা মৌজার ৯৫ নম্বর জেএলভুক্ত ৬৬০ ও ৬৬২ দাগে অবস্থিত। এর মোট পরিমাণ ১০ শতাংশ। রিভিশন মামলার পরবর্তী শুনানির তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে ৯ নভেম্বর ২০২৬।

রোকেয়া বেগমের পক্ষের অভিযোগ, জামাল খানের নামে নতুন নামজারি অনুমোদনের আগে তাঁদের যথাযথ নোটিশ দেওয়া হয়নি। নোটিশ দেওয়া হলে তাঁরা আপত্তি জানিয়ে নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরার সুযোগ পেতেন বলে দাবি তাঁদের।

একই জমিতে প্রথমে নামজারি অনুমোদন, পরে তা বাতিল এবং এরপর প্রতিপক্ষের নামে নতুন করে নামজারি অনুমোদনের প্রতিটি সিদ্ধান্তের পেছনে কী যুক্তি ও নথি ছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। রিভিশন মামলা চলমান থাকার বিষয়টি নতুন নামজারির ক্ষেত্রে কীভাবে বিবেচনা করা হয়েছিল, সংশ্লিষ্ট পক্ষকে নোটিশ দেওয়া ও শুনানির সুযোগ রাখা হয়েছিল কি না এবং নতুন অনুমোদনের ভিত্তি কী ছিল—এসব বিষয় সংশ্লিষ্ট নথি পর্যালোচনার মাধ্যমে স্পষ্ট হতে পারে।

এদিকে, বিষয়টি নিয়ে সাবেক কয়েকজন উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও তহশিলদারের সঙ্গে কথা হলে তাঁরা জানান, বিরোধপূর্ণ জমির চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত সাধারণত তাঁরা ওই জমির নামজারি অনুমোদন দেওয়া থেকে বিরত থাকেন। তাঁদের ভাষ্য, এ ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট আইনি বাধ্যবাধকতা থাকুক বা না থাকুক, এমন পরিস্থিতিতে নামজারি অনুমোদন না দেওয়াটা তাঁদের প্রশাসনিক চর্চার অংশ।

চাঁদপুর ল’ কলেজের শিক্ষক ও আইনজীবী শেখ সাদী বলেন, “সাধারণত উচ্চ আদালতে কোনো মামলা চলমান থাকলে নিম্ন আদালতে ওই বিষয়ে কার্যক্রম বন্ধ থাকে—এটাই আমরা জানি।”

এ বিষয়ে ফরিদগঞ্জ উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) আনিসুর রহমান বলেন, “মামলা চলমান থাকলেই নতুন খারিজের অনুমোদন দেওয়া যাবে না—এমন কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা নেই। তবে সাধারণত এ ধরনের বিষয় আমরা হোল্ডে রাখি বা এড়িয়ে চলি।”

তৎকালীন উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) এ. আর. এম. জাহিদ হোসেন বদলি হয়ে যাওয়ায় এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

বিষয়টি সম্পর্কে চাঁদপুরের জেলা প্রশাসক আহমেদ জিয়াউর রহমান বলেন, “এমনটা হওয়ার কথা না। তবে আসলে কী হয়েছে, আমাকে ডকুমেন্টগুলো দেন। আমি দেখে আপনাকে জানাব।”