চাঁদপুরের হাজীগঞ্জ উপজেলার ৬১নং রায়চোঁ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তৃতীয় তলায় টিচার্স রুম নির্মাণে চলছে চরম অনিয়ম, দায়িত্বহীনতা ও স্বেচ্ছাচারিতা। প্রায় ২০ লাখ টাকার এই সরকারি প্রকল্পে নিয়ম বহির্ভূত কার্যক্রম, নিম্নমানের মালামাল ব্যবহার এবং প্রকৌশল দপ্তরের উদাসীনতার কারণে প্রশ্ন উঠেছে পুরো প্রকল্পের স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তা নিয়ে।
২০২৩-২৪ অর্থবছরের পিইডিপি-৪ (চতুর্থ প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি) এর আওতায় এই কাজের দায়িত্ব পান ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এম.এস. কাদের। অথচ প্রতিষ্ঠানটি কোনো পূর্ব অনুমতি বা সরকারি নিয়ম না মেনে, বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে না জানিয়ে নিজ ইচ্ছেমতো তৃতীয় তলার ছাদের ঢালাইয়ের কাজ শুরু করে।
গত ২৬ জুন সকালে হঠাৎ বিদ্যালয়ের ভেতরে কাজ শুরু করে ঠিকাদারের লোকজন। বিষয়টি জানার পর স্থানীয় অভিভাবক ও এলাকাবাসী এসে দেখেন, ৪-৫ মাস আগে আনা পুরনো ও জমাট বাঁধা সিমেন্ট পাথরের মতো ভেঙে ঢালাইয়ের কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। এছাড়া সিলেকশন বালুর পরিবর্তে ব্যবহার করা হচ্ছিল নিম্নমানের ভিটি (বিটা) বালু, যা নির্মাণ মানে মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা শিরিনা আক্তার শামীম বলেন, “কোনো অফিস আমাকে অবহিত করেনি। হঠাৎ শুনি ঢালাই হচ্ছে। এসে দেখি কী ভয়ংকর অনিয়ম চলছে। আমি বিষয়টি উপজেলা শিক্ষা অফিসে জানিয়ে ইউএনও মহোদয়কে জানাই, তখন তিনি কাজ বন্ধের নির্দেশ দেন।”
তিনি আরও বলেন, “সবচেয়ে অবাক করা বিষয়, এখনো পর্যন্ত আমি কোনো ওয়ার্কশিট পাইনি। আমি একাধিকবার উপজেলা সার্ভেয়ার মালবিকাকে ফোন করেছি, অফিসে গিয়েছি, কিন্তু কোনো কাজ হয়নি। কত টাকা বরাদ্দ, কত ফিট নির্মাণ, কত গভীরতা—আমি কিছুই জানি না।”
এ বিষয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত উপজেলা সার্ভেয়ার মালবিকা দেবনাথ বলেন, “ঠিকাদার আমাদের না জানিয়েই কাজ শুরু করেছে। পরে আমি গিয়ে কিছু নতুন সিমেন্ট ও সিলেকশন বালু এনে দিয়েছি।”
এই বক্তব্যে তার নিজের দায়িত্ব অবহেলার প্রমাণ নিজেই উঠে আসে। প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য — ওয়ার্কশিট — বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে না দেওয়া, এবং অনিয়মের বিষয়ে আগেভাগে ব্যবস্থা না নেওয়ার দায় সম্পূর্ণভাবে মালবিকা দেবনাথ এড়াতে পারেন না।
প্রধান শিক্ষিকা তার সামনে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করে বলেন, “আপনারা বারবার বলেও ওয়ার্কশিট দেননি। প্রতিশ্রুতি দিয়েও রাখেননি।”
ঠিকাদার এম.এস. কাদের এর বিরুদ্ধে অভিযোগ আরও গুরুতর। তিনি কোনো নিয়ম মানছেন না, প্রকৌশল বিভাগ বা বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা উপেক্ষা করছেন, এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে সরকারি টাকা ও জনস্বার্থের সঙ্গে চরম খেলা করছেন। একাধিকবার ফোন দিলেও তিনি সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেননি, যা তার দায় এড়ানোর প্রবণতা ও দম্ভের প্রকাশ।
এ বিষয়ে হাজীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইবনে আল জাহিদ হোসেন-কে একাধিকবার ফোন দিলেও তিনি কল রিসিভ করেননি।
স্থানীয় অভিভাবক ও সচেতন মহল বলেন, “সরকারি টাকায় শিশুদের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার কথা, অথচ এখানে সেই ভবিষ্যৎই অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। এটা শুধু অনিয়ম নয়, এটা জনগণের সঙ্গে প্রতারণা।”
তারা দায়ী ঠিকাদার, সার্ভেয়ার ও দায়িত্বে অবহেলা করা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত সাপেক্ষে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান।




















