পুরোনো পাবলিক টয়লেটে রং, সামান্য টাইলস ও ঢালাইয়ের কাজ করে নতুন প্রকল্প বাস্তবায়নের অভিযোগ উঠেছে চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ উপজেলার রূপসা বাজারে। জেলা পরিষদের দুই লাখ টাকার প্রকল্পে সরেজমিনে দেখা গেছে দুটি সাইনবোর্ড, অথচ বিল-সংক্রান্ত নথির সঙ্গে জমা দেওয়া ছবিতে রয়েছে একটি। স্থানীয়দের দাবি, কাজটিতে সর্বোচ্চ ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা ব্যয় হয়ে থাকতে পারে। আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো, প্রকল্পটি পিআইসি পদ্ধতিতে বাস্তবায়নের কথা থাকলেও কাজটি কে করেছেন, তা জানেন না স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও বাজার কমিটির সভাপতি। জেলা পরিষদের এক কর্মকর্তার দাবি, কাজটি করেছেন প্রশাসকের ভাগিনা ও ভাতিজা।
সরেজমিনে দেখা যায়, রূপসা বাজারের একই পাবলিক টয়লেটে দুটি সাইনবোর্ড লাগানো রয়েছে। একটি ২০২২-২০২৩ অর্থবছরের হাটবাজার উন্নয়ন খাতের প্রকল্পের, অন্যটি ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে জেলা পরিষদের বরাদ্দের প্রকল্পের।
পুরোনো সাইনবোর্ডে টয়লেট নির্মাণে ২ লাখ ৯৯ হাজার ৯৯৯ টাকা ৮৩ পয়সা বরাদ্দের তথ্য রয়েছে। নতুন সাইনবোর্ডে জেলা পরিষদের এডিপির আওতায় ‘রূপসা বাজারে পাবলিক টয়লেট নির্মাণ’ প্রকল্পে দুই লাখ টাকা বরাদ্দের উল্লেখ রয়েছে।
কিন্তু সরেজমিনে নতুন কোনো টয়লেট নির্মাণের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। বরং পুরোনো টয়লেটটিতে নতুন করে রং করা, অল্প কিছু টাইলস লাগানো এবং সামনের অংশে সামান্য ঢালাইয়ের কাজ দেখা গেছে। স্থানীয়দের দাবি, এসব কাজে সর্বোচ্চ ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা ব্যয় হয়ে থাকতে পারে।
প্রকল্পের বিল-সংক্রান্ত নথি যাচাই করতে জেলা পরিষদে গিয়ে জমা দেওয়া ছবিতে টয়লেটের একটি সাইনবোর্ড দেখা গেছে। অথচ সরেজমিনে একই স্থাপনায় দুটি সাইনবোর্ড রয়েছে। এ পার্থক্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে—ছবি জমা দেওয়ার আগে সেটি সম্পাদনা করা হয়েছিল কি না।
প্রকল্পটি প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি বা পিআইসি পদ্ধতিতে বাস্তবায়নের কথা থাকলেও স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও বাজার কমিটির সভাপতি কাজটি সম্পর্কে অবগত নন বলে দাবি করেছেন। তাঁদের বক্তব্য অনুযায়ী, অপরিচিত একজন ব্যক্তি এসে টয়লেটে কিছু কাজ করে চলে গেছেন।
বাজার কমিটির সভাপতি আজিম বলেন, একজন ব্যক্তি এসে রংসহ কিছু কাজ করে চলে গেছেন। তাঁকে তিনি চেনেন না। ওই ব্যক্তি প্রথম বিলের জন্য তাঁর কাছ থেকে একটি কাগজে স্বাক্ষর নিয়েছেন। তবে চূড়ান্ত বিলের জন্য তিনি কোনো কাগজপত্রে স্বাক্ষর দেননি বলে দাবি করেন তিনি।
পিআইসি পদ্ধতিতে প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কমিটি গঠন, দায়িত্ব বণ্টন, কাজের তদারকি, ব্যয়ের হিসাব ও বিল-ভাউচারের নথি সংরক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি প্রকল্পের অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে অনুমোদিত প্রাক্কলন ও বাস্তবে সম্পন্ন কাজের সামঞ্জস্য থাকা প্রয়োজন।
স্থানীয় সরকার বিভাগের জেলা পরিষদের এডিপি প্রকল্পসংক্রান্ত নির্দেশনায় প্রকল্প বাস্তবায়ন, অর্থের সুষ্ঠু ব্যবহার ও তদারকির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। । এ ক্ষেত্রে প্রকল্পটির অনুমোদিত বাস্তবায়নপদ্ধতি ও সংশ্লিষ্ট নির্দেশনা মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।
বিলের বিষয়ে খোঁজ নিতে জেলা পরিষদে গেলে এখানকার কর্মকর্তা কুদ্দুস বাট্র সাংবাদিকদের জানান, প্রকল্পটির কাজ জেলা পরিষদের প্রশাসকের ভাগিনা ও ভাতিজা করেছে।
এদিকে ১৫ নং রূপসা উত্তর ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জহিরুল ইসলাম জানান, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে চিঠি পাওয়ার পর তিনি প্রকল্পটির বিষয়ে জানতে জেলা পরিষদে যান। দুই লাখ টাকায় নতুন টয়লেট নির্মাণ সম্ভব হবে না বিবেচনায় বিদ্যমান টয়লেট সংস্কারের বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা পরিষদ থেকে তাঁকে নতুন টয়লেট নির্মাণের কথা বলা হয়।
পরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে আলোচনা করে তিনি কাজটি করেননি বলে জানান। তাঁর ভাষ্য, এরপর হঠাৎ দেখতে পান, কে বা কারা টয়লেটটিতে কাজ করে চলে গেছেন।
গত ১৪ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে ফরিদগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ দেন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. জহিরুল ইসলাম। অভিযোগে তিনি উল্লেখ করেন, ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে জেলা পরিষদের এডিপির বিশেষ প্রকল্পের আওতায় রূপসা বাজারে পাবলিক টয়লেট নির্মাণে দুই লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। প্রকল্পটি ২০২৫ সালের ২৯ মে জেলা পরিষদের সভায় অনুমোদিত হয়।
অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার স্বাক্ষরিত ৯ এপ্রিল ২০২৬ তারিখের চিঠির মাধ্যমে তাঁকে প্রকল্পটির বিষয়ে জানানো হয়। পরে জেলা পরিষদে যোগাযোগ করে তিনি জানতে পারেন, নতুন টয়লেট নির্মাণ না করে আগের অর্থবছরে নির্মিত টয়লেটটিতে রং করে নতুন প্রকল্পের সাইনবোর্ড লাগানো হয়েছে বলে তাঁর অভিযোগ।
একই স্থাপনায় দুই অর্থবছরের দুটি সাইনবোর্ড, বিলের সঙ্গে জমা দেওয়া ছবির সঙ্গে সরেজমিনের দৃশ্যের পার্থক্য, কাজের পরিমাণ নিয়ে প্রশ্ন এবং বাস্তবায়নকারীর পরিচয় সম্পর্কে স্থানীয় প্রতিনিধিদের অজ্ঞতা—সব মিলিয়ে প্রকল্পটির স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
এ বিষয়ে চাঁদপুর জেলা পরিষদের বর্তমান প্রশাসক অ্যাডভোকেট এ কে এম সলিম উল্যা সেলিম জানান, তার কোন ভাগিনা না কিংবা ভাতিজা এসব কাজ করে না। এসব মিথ্যা কথা।

























